মহাশ্বেতা দেবী মূলত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনালেখ্য রচয়িতা। সাধারণত অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া, ভৌগোলিক কারণে বিচ্ছিন্ন, সামাজিকভাবে বঞ্চিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও শারীরিক-মানসিকভাবে দুর্বল মানুষেরা প্রান্তিক হিসেবে বিবেচিত। তবে এই প্রান্তিকতার অন্তর্নিহিত কারণ হিসেবে রাষ্ট্র ও প্রভাবশালীদের নিপীড়ন ব্যাপকভাবে দায়ী। তাই এই প্রান্তিক মানুষেরা নিজ অধিকারের জন্য লড়াইয়ে নামে; নিশ্চুপ থাকতে থাকতে একসময় চিৎকার করে ওঠে। নিপীড়ন বিষয়ে অন্যান্য নারী লেখকদের থেকে মহাশ্বেতা দেবীর দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট ভিন্ন। অন্যরা যেখানে দরিদ্র, মধ্য ও উচ্চবিত্ত নারীর গার্হস্থ্য ও লৈঙ্গিক নিপীড়ন বিষয়ে মনযোগী, সেখানে তিনি শ্রেণি ও বর্ণের মধ্যে মূর্ত নিপীড়নের সাথে লৈঙ্গিক বিভেদও তুলে ধরেন। তার এই সচেতন ত্রিমুখি অন্বেষণ তাঁর রচনাকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছে।
সামাজিক-অর্থনৈতিক শ্রেণিবিন্যাসের মাঝেই ধর্ম-বর্ণ-লৈঙ্গিক নিপীড়নের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায়। প্রান্তজনের দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা ও গাত্রবর্ণের কারণে বহু আগে থেকেই ভারতীয়রা শোষিত হয়ে আসছে। ইংরেজ শাসনামলে এই বৈষম্য ও অবমাননা চরমে পৌঁছেছিল। ধর্মীয় পার্থক্য, ভূমির অসম বণ্টন, জাতিভেদ ও সামাজিক অবস্থানের কারণে সৃষ্ট অসংখ্য অর্থনৈতিক সমস্যা দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষদের আরো বেশি শোষণের সুযোগ করে দিয়েছিল। সম্পত্তির একচেটিয়া মালিকানার মাধ্যমে উচ্চশ্রেণি বা বর্ণের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রিভূত হয়েছিল। উচ্চ ও নিম্নশ্রেণির মধ্যে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল, কারণ উচ্চ শ্রেণির লোকেরা তাদের নিজস্ব নিয়মকানুন প্রয়োগ করত এবং ধর্ম ও প্রথার দোহাই দিয়ে তাদের সেই নিয়ম মানতে বাধ্য করত। ফলে যে বিভক্ত সমাজ তৈরি হয়েছিল সেখানে ছিল বঞ্চিত-সুবিধাপ্রাপ্ত, ভূস্বামী-ভূমিহীনের দ্বন্দ্ব আর পরিবার-সমাজ কর্তৃক নানাভাবে শোষিত ও বঞ্চিত নারী।
জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে মানুষের সামাজিক পরিচয় নির্ণয় একটি প্রাচীন পদ্ধতি যা মানুষকে মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। তাদের ভিন্ন ভিন্ন পেশা, সংস্কৃতি, প্রথা, আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি ও নিয়মকানুন দিয়ে তার মর্যাদা বা অমর্যাদার স্থান নিরূপিত হয়। ভারতীয় সামাজিক স্তরে বিভিন্ন গোষ্ঠীগুলোর বিন্যাস উপর থেকে নিচে পর্যন্ত বিস্তৃত, যেখানে ব্রাহ্মণরা শীর্ষে এবং আদিবাসী ও দলিতরা সর্বনিম্নে অবস্থান করে। উচ্চবর্ণের সঙ্গে নিম্নবর্ণের সামাজিক সম্পর্ক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত ছিল। এই সমস্যাগুলোর মর্মান্তিক ও অমানবিক দিকগুলো মহাশ্বেতা দেবীর লেখায় উঠে এসেছে যা ভারতীয় সমাজের প্রান্তিক বা তৃণমূলের বাস্তবতা। তাঁর রচনায় দলিত ও উপজাতি শোষণকে ঘিরে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে যে পার্থক্য, সেই দ্বন্দ্বের সূত্র রয়েছে অর্থনৈতিক শোষণের মাঝে যা মূলত শ্রেণি নিস্পেষণ ব্যতীত আর কিছুই নয়। বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির বুর্জোয়া অধিপতিরাই সবকিছুর মালিক, আর বাকিরা প্রান্তবর্তী, যারা বেঁচে থাকার জন্য শ্রম ও সম্মান বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
‘স্তনদায়িনী’ গল্পে মাতৃত্বের প্রচলিত মহিমা ভেঙে নারীর প্রান্তিকতা ও শোষণ অত্যন্ত তীব্র ও নির্মমভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এখানে শোষণের একটি পারিবারিক, শ্রেণিগত ও সামাজিক চক্র রয়েছে। কাঙালীচরণের প্রজননগত শোষণটি পারিবারিক, হালদার বাড়ির দুগ্ধশ্রমের শোষণটি শ্রেণিগত, আর উপযোগিতা শেষে বর্জন ও নিঃসঙ্গ মৃত্যু হলো সামাজিক শোষণ। যশোদার জীবনচক্রের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে শ্রেণি, লিঙ্গ ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা একজন প্রান্তিক নারীর শরীর ও শ্রমকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার শেষে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
যশোদা স্বেচ্ছায় কিংবা আবেগের কারণে অন্য শিশুদের দুধ খাওয়ায়নি, বরং চরম দারিদ্র্যের কারণে সে তার মাতৃত্বকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়। হালদার বাড়ির গৃহিণীর ভাষায় যশোদা হলো বিধাতার পাঠানো ‘কামধেনু’। গল্পে বলা হয়েছে, যশোদা ৫০টি শিশুকে স্তন দান করেছে, সে পেশাজীবী মা। অর্থাৎ, যে মাতৃত্বকে সমাজে পবিত্র ও স্বর্গীয় বলা হয়, যশোদার ক্ষেত্রে তা বেঁচে থাকার এক নির্মম শ্রমবিক্রয়ের পেশায় পরিণত হয়েছে। হালদার পরিবার তার এই শারীরিক ক্ষমতাকে নামমাত্র মূল্য ও খাবারের বিনিময়ে বছরের পর বছর কিনে নিয়েছে যা চরম শারীরিক শোষণ।
কিন্তু যশোদা কেবল হালদার বাড়ির দ্বারা শোষিত হয়নি, বরং তার নিজের ঘরের পুরুষতন্ত্রের কাছেও সে ছিল প্রান্তিক। তার স্বামী কাঙালীচরণ নিজে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর সংসারের কোনো দায়িত্ব নেয়নি। উল্টো যশোদার স্তনে যাতে অনবরত দুধ আসে, সেজন্য সে যশোদাকে নিয়মিত গর্ভবতী করেছে। যশোদার নিজের শরীর বা প্রজনন ইচ্ছার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর চাপে সন্তান জন্মদান ও অন্যের সন্তান লালন-পালনের এক অদ্ভুত চক্রে সে বন্দি হয়ে পড়েছিল। নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র নারী হওয়ার কারণে সমাজে তার অবস্থান ছিল একদম প্রান্তিক স্তরে। উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্ণের হালদার পরিবার তাদের নিজেদের আভিজাত্য, সৌন্দর্য ও শরীর ঠিক রাখার জন্য যশোদার স্তনদুগ্ধ কিনে নেয়। এখানে শ্রেণির আধিপত্য সুস্পষ্ট— ধনীরা কেবল শ্রম কেনে না, দরিদ্রের শরীরের পুষ্টিও কিনে নেয়।
কিন্তু যশোদার শেষ পরিণতি ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। যখন যশোদার বয়স বাড়ে এবং স্তনের দুধ শুকিয়ে যায়, তখন হালদার পরিবারের কাছে তার উপযোগিতাও শেষ হয়ে যায়। যে স্তন দিয়ে সে নিজের ২০টি ও হালদারদের ৩০টি, মোট ৫০টি সন্তানকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেই স্তনেই তার মরণব্যাধি ক্যানসার বাসা বাঁধে। এই চরম সংকটের দিনে হালদার বাড়ির কেউ, এমনকি তার নিজের সন্তানেরাও পাশে দাঁড়ায়নি। হাসপাতালের বিছানায় সম্পূর্ণ একা, গলিত স্তন নিয়ে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হয় তার।
মহাশ্বেতা দেবী যশোদার এই রূপকের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশোত্তর প্রান্তিক সমাজকেই তুলে ধরেছেন— যে সমাজের মানুষদের সবাই শোষণ করে বেড়ে ওঠে, কিন্তু তাদের নিজেদের ভাগ্যে জোটে কেবল নির্মম অবহেলা ও মৃত্যু।

