নিজস্ব প্রতিবেদক :
বকুলগাছের ছায়া পেরিয়ে পুকুরপাড়ের দিকে এগোতেই চোখ আটকে যায় সারি সারি কাচের ট্যাংকে। স্বচ্ছ পানির ভেতর লাল, নীল, কমলা, হলুদসহ নানা রঙের ছোট ছোট মাছের ছুটে চলা যেন এক জীবন্ত শিল্পকর্ম। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ মাছের পরিচর্যা সম্পর্কে জানতে চাইছেন, আবার কেউ এসেছেন নতুন ব্যবসার স্বপ্ন নিয়ে। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সিংহস্রী ইউনিয়নের বরিবাড়ী গ্রামের এই ব্যতিক্রমী খামারটির উদ্যোক্তা সাখাওয়াত মামুন। তবে, মাছপ্রেমীদের কাছে তিনি বেশি পরিচিত ‘গাপ্পি বিডি মামুন’ নামে।
আজ যে খামারে শতাধিক ট্যাংকে প্রায় ২০ প্রজাতির বাহারি মাছের উৎপাদন হচ্ছে, সেই যাত্রার শুরুটা ছিল একেবারেই ছোট। প্রায় এক যুগ প্রবাসজীবন কাটিয়ে ২০১৯ সালের শেষ দিকে দেশে ফেরেন মামুন। চাকরি কিংবা প্রচলিত ব্যবসায় না গিয়ে ইউটিউব দেখে শখের বশে মাত্র তিন হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন। কেনেন তিনটি ট্যাংক আর তিন জোড়া গাপ্পি মাছ। তখন কোথায় মাছ বিক্রি করবেন, বাজার কেমন- এসব বিষয়ে তার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না।
মামুন জানান, শুরুতে অ্যাকুরিয়াম নিয়েই কাজ করতেন। ধীরে ধীরে মাছের প্রজনন ও উৎপাদনে মনোযোগ দেন। নিজের ‘গাপ্পি বিডি’ নামে ফেসবুক পেজে নিয়মিত ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করতে থাকেন। সেখান থেকেই বাড়তে থাকে ক্রেতাদের আগ্রহ। একসময় অনলাইন পরিচিতিই তার উদ্যোগকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেয়।
বর্তমানে মাত্র তিন শতাংশ জমির ওপর গড়ে ওঠা খামারটিতে রয়েছে শতাধিক ট্যাংক। প্রতিটি ট্যাংকের দৈর্ঘ্য চার ফুট এবং প্রস্থ দুই ফুট। এখানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২০ প্রজাতির বাহারি মাছ। এর মধ্যে উন্নত জাতের গাপ্পি মাছের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। নতুন নতুন জাতের মাছ সংগ্রহের জন্য বিদেশ থেকেও মাছ আনতে হয় বলে জানান মামুন।
রঙিন এই মাছগুলোর সুস্থতা নিশ্চিত করতে প্রতিদিন প্রায় তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন মামুন। কিছু খাবার বিদেশ থেকে আনলেও অধিকাংশ খাবার নিজেই তৈরি করেন। প্রতি ১০ দিন পরপর ট্যাংকের নিচে জমে থাকা বর্জ্য পরিষ্কার করা হয়। রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজন অনুযায়ী মোটা লবণসহ বিভিন্ন পরিচর্যা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
খামারে উৎপাদিত মাছ এখন শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। অনলাইন ও অফলাইন- দুই মাধ্যমেই দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। বিশেষ প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে জীবন্ত মাছ নিরাপদে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে, সম্ভাবনা থাকলেও এখনো বিদেশে রপ্তানির সুযোগ না পাওয়ায় আক্ষেপ রয়েছে এই উদ্যোক্তার।
মামুনের ভাষ্য, তার এই উদ্যোগ দেখে ইতোমধ্যে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ জন নতুন উদ্যোক্তা বাহারি মাছের খামার গড়ে তুলেছেন। এতদিনেও তিনি সরকারি কোনো প্রশিক্ষণ, ঋণ কিংবা মৎস্য বিভাগের কারিগরি সহায়তা পাননি।
তিনি বলেন, “অনেকে মনে করেন বাহারি মাছের চাষ শুধু শখের বিষয়। বাস্তবে, এটি একটি লাভজনক সম্ভাবনাময় খাত। মাত্র দুই থেকে তিন হাজার টাকা দিয়েও একজন তরুণ শুরু করতে পারেন। ধৈর্য, যত্ন ও পরিকল্পনা থাকলে সফলতা আসবেই।”
নতুন প্রজন্মের প্রতি তার আহ্বান, সময় নষ্ট না করে সৃজনশীল ও উৎপাদনমুখী কাজে যুক্ত হওয়া উচিত। এতে যেমন নিজের কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তেমনি মানসিক প্রশান্তিও মিলবে। অভিভাবকদেরও সন্তানদের এমন উদ্যোগে উৎসাহিত করার পরামর্শ দেন তিনি।
মামুনের বড় ভাই মাসুদ বলেন, “শুরুর দিকে অনেকেই ওকে নিয়ে হাসাহাসি করতেন। কিন্তু, সে নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যায়নি। এখন তার সাফল্য দেখে আমাদের এলাকাসহ আশপাশের অনেক মানুষ বাহারি মাছের খামার গড়তে আগ্রহী হচ্ছেন।”
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, দিনদিন বাহারি মাছের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ শুধু মাছ কিনতেই নয়, এই খামারটি দেখতে এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ নিয়েও আসছেন। শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের মধ্যে এ নিয়ে উৎসাহ বাড়ছে।
কাপাসিয়া উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জান্নাতুন শাহীন বলেন, “গত সাত মাস ধরে এখানে কর্মরত আছি। বিষয়টি আগে আমার জানা ছিল না। আগের কর্মকর্তার কাছ থেকেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাইনি। এখন খোঁজ নিয়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।”
মাত্র তিন হাজার টাকার একটি শখ যে একদিন শতাধিক ট্যাংকের সফল উদ্যোগে রূপ নেবে, তা হয়তো শুরুতে কেউ ভাবেননি। মামুন দেখিয়ে দিয়েছেন- স্বপ্ন যদি থাকে, পরিশ্রম যদি অবিরাম হয়, তবে ছোট একটি উদ্যোগও একসময় অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠতে পারে।
//L//

