ভূঞাপুর প্রতিনিধি
মাত্র ৮০০ টাকা পুঁজি নিয়ে বিদেশি ফল ‘প্যাশন ফ্রুট’ যা বাংলাদেশে ‘আনারকলি’ নামে পরিচিত, সেই ফল চাষ করছেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল আকন্দ। আনারকলি ফল চাষ করে স্বপ্ন দেখছেন স্বাবলম্বী হওয়ার।
সোহেল আকন্দ ভূঞাপুর পৌর শহরের বামনহাটা গ্রামের মৃত আবুল কালাম আকন্দের ছেলে।
জানা যায়, উপজেলা পৌর শহরের বামনহাটা গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা সোহেল আকন্দ। ৬ মাস আগে কক্সবাজারের চকরিয়ার এক চাষির কাছ থেকে মাত্র ৮০০ টাকায় কয়েকটি আনারকলি গাছের চারা সংগ্রহ করে বাড়ির পরিত্যক্ত আঙিনায় পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন। বর্তমানে প্রতিটি গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে রসালো ও সুস্বাদু আনারকলি। আকার ভেদে প্রতি পিস ফল ৩০ থেকে ৬০ টাকা দরে ফেসবুকের মাধ্যমে বিক্রি করছে। বাড়িতে এসেও কিনে নিচ্ছেন অনেকে। আনার কলির পাশাপাশি বাড়ির উঠানে গড়ে তুলেছেন মিনি নার্সারি, যেখানে রয়েছে বিভিন্ন ফলজ ও বনজ বৃক্ষ।
স্থানীয়রা বলছেন, এর আগে তারা আনারকলি ফলের চাষ কখনো দেখেননি। সোহেলের এই সাফল্য সবাইকে অবাক করেছে। কৃষি বিভাগের সঠিক পরামর্শ ও সহযোগিতা পেলে এই ফল চাষের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব।
কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল আকন্দ বলেন, “প্রথমে আমি কক্সবাজার গিয়ে আনারকলি ফলের স্বাদ নেই। আনারকলি ফল ভালো লাগে। আমি ভাবি যে যদি এটা আমি চাষ করি কেমন হয়? তখন আমার ওখান থেকে নিজের ভেতরে একটা ইচ্ছা কাজ করে যে আমি গাছটা সংগ্ৰহ করব। এই গাছটা সংগ্ৰহ করার জন্য প্ৰথমে আমার অনেক ঘুরতে হয়েছে। অনেকে তো নার্সারি থেকে ভালো গাছ দিতে পারে না। সেই ক্ষেত্রে আমি সঠিক জাত নির্বাচন করি। ভালো একজন বিশ্বস্ত মানুষের নার্সারি থেকে আমি জাতটা সংগ্রহ করি। তারপরে আস্তে আস্তে আমি গাছগুলো লাগাই। লাগানোর পরে এই গাছের প্ৰতি আমার তেমন কোন ধারণা ছিল না। আসলে কিভাবে কি করতে হয়। প্রথম দিকে গাছ লাগানোর পর অনেক সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছে। আনারকলি গাছে ফুল হলেও তা ঝড়ে পড়ে যেতো। অনেকের সাথে পর্রামশ নেই, গাছে ঠিকমতো পরিচর্যা ও যত্ন নেই। এখন প্রচুর পরিমাণ ফল আসা শুরু হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এ বছর এপ্রিল মানুষে তিনটি আনারকলি চারা রোপন করি। জুলাই মাস থেকে গাছে আনারকলি ফল আসতে শুরু করছে। আমাকে অনেকেই ফেইসবুকে আনারকলি ফল চাচ্ছে। তাদের আমি আনারকলি ফল দিচ্ছি। বাজারে এই ফলের চাহিদা আছে। আমাদের এলাকায় এই ফল নতুন। এক কেজিতে ১০-১২ টি ফল ধরে। প্রতি কেজি আনারকলি ফল ৬৫০ টাকা -৭০০ টাকা বিক্রি করা যায়। পরিচিত বন্ধু-বান্ধবরা আমার কাছে এই ফল চাচ্ছে। এখন তো অল্প পরিসরে করেছি। সামানে আমার চিন্তা-ভাবনা আছে বড় পরিসরে আনারকলি ফল চাষ করার।”
তিনি আরও বলেন, “বিদেশে যাওয়ার আশায় ও চাকরির পেছনে ঘুরে দালালের খপ্পরে পড়ে অনেক টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এখন নিজে থেকে কিছু করার চিন্তা থেকেই কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছি।”
স্থানীয় আব্দুল লতিফ বলেন, “মূলত এই ফলটি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ফল। এটি একটি বিদেশী ফল। আমাদের টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে এই ফলটি আগমন করেছে। যে এই ফলের উদ্যোক্তা সোহেল ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। সে বিগত দিনে চাকরি ও বিদেশে যাওয়ার জন্য টাকা জমা দিয়ে ছিল। টাকা গুলো তুলতে পারে নাই, ধরা খেয়েছে। এই ফলটি চাষ করে সে স্বাবলম্বী হতে চায়। বাগানটাই এসে দেখলাম। অল্প পরিসরে শুরু করলেও গাছে পর্যাপ্ত ফল ধরেছে। ভালোই বিক্রি হচ্ছে। আমাদের এলাকায় চাহিদাও ভালো আছে। এই ফলের চাষ যদি প্রসার ঘটাতে পারে। তার বেকারত্ব দূর হবে। আশা করছি কৃষি কর্মকর্তা তার প্রতি নজর দিবেন।”
স্থানীয় আখতার হোসেন বলেন, “আনারকলি ফল ঢাকা এবং কক্সবাজার এলাকায় খুব বেশি দেখা যায়। আমি নিজে থেকে খাইনি যেহেতু কখনো খাই নাই আগ্রহ জাগে নাই। আজকে যেটা দেখলাম আসলে চমৎকার একটি ফল।স্বাদের দিক থেকেও মজা। ছেলেটা যে কাজটা করছে এটা আসলে নজিরবিহীন। ফলটা আমাদের এলাকায় পাওয়া যায় না। বেচা-কেনা হয় না। আমাদের দেশে বেকাররা যদি কৃষি ক্ষেত্রে যদি উদ্যমী হয় উদ্যোগী হয়, তাহলে আমার মনে হয় যে ভালো করবে। আমি আশা করছি যে সে লাভবান হবে। আমার গ্রামের ছেলে এই ফলটি চাষ করছে। আমি আশা করব যে এখান থেকে এই ফল শুধু বিক্রি করে না, চারা উৎপাদন করে যাতে এলাকায় এটা বিস্তার ঘটাতে পারে। সোহেলের দেখাদেখি যেন আরও যুবকরা এই কাজে উৎসাহিত হয়। আনারকলি ফল চাষাবাদ করে।”
ভূঞাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, “ভূঞাপুর উপজেলা পৌরসভার অন্তর্গত বাবানহাটা গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা সোহেল তার নিজস্ব বাড়ির উঠানে প্রায় অর্ধশতক জমিতে প্যাশন ফ্রুট বা আনারকলি ফল বাগান করেছেন। আমরা সরেজমিনে ফলবাগানে গিয়েছিলাম। তাকে উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এই ফল বাগান ভবিষ্যতে সম্প্ৰসারিত করার জন্য যে সকল টেকনিক্যাল, কারিগরি বা অন্য যে সকল সহযোগিতা প্রয়োজন সেটা আমরা করব।
//L//

