দ্যুতিময় বুলবুল:
আজ আমি এমন একজনের কথা লিখছি-সঙ্গীত তাঁর পেশা, সেবা তাঁর নেশা, আর মানবিকতা তাঁর ধর্ম। তিনি হলেন, পলক মুছল, জনপ্রিয় ভারতীয় কণ্ঠশিল্পী ও গীতিকার। একইসঙ্গে তিনি একজন বিস্ময়কর মানবতাবাদী ও সমাজসেবী। এই সময়ের অন্যতম মানব দরদী, এই মানবিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বলিউডের সর্বাধিক শ্রদ্ধেয় ও জনপ্রিয় গায়িকাদের অন্যতম।
কারণ, পলক মুছল গান করে তাঁর উপার্জিত অর্থের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেন মানবতার সেবায়। সমাজ ও মানুষকে মনে-প্রাণে ভালোবেসেই এই সেবার পথ বেছে নিয়েছেন তিনি, সেই শিশুকালে, মাত্র সাত বছর বয়সে। তারপর থেকে আজ ৩৪ বছর বয়স অবধি পলক, অবিরাম মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু ঢাকঢোল পিটিয়ে নয়, নীরবে-নিভৃতে, মনের আনন্দে, মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে।
যে সব মানুষের-বিশেষ করে, যে সব শিশুদের চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন, তাঁদের আর্থিক সাহায্য করেন পলক। নিজে গান গেয়ে উপার্জিত অর্থে পলক নিজস্ব সাহায্য সংস্থা ‘পলক-পলাশ চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশন’প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেই সেবা কেন্দ্র থেকে ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি প্রায় ৪,০০০ অসহায় শিশুর হৃদরোগের সফল অস্ত্রোপচারের সমুদয় খরচ বহন করেছেন তিনি।
আর এ জন্য দেশে-বিদেশে প্রচুর গান করে তহবিল গড়ছেন তিনি। তাই প্রতিটি অনুষ্ঠানে দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, প্রচুর টাকা লাগবে আমার। এক একটি অনুষ্ঠান থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে ১২/১৪টি শিশুর হার্ট অপারেশন হয়। শ্রোতারাও তাঁর কণ্ঠ, সেবা ও মহৎ উদ্দেশ্যের ব্যাপারে মুগ্ধ। তাই তারা সাধ্যমত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
সেই অর্থ দিয়েই গরীর ও অসহায় শিশুদের সফল হার্ট অপরারেশ করে, তাদের জীবন বাঁচান পলক। ক্লান্তিহীনভাবে এই মানবিক সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাই পলক মুছল ভারতের এই সময়ের অন্যতম সেরা সঙ্গীত শিল্পী হলেও, মানবতার সেবার জন্যই তিনি অধিকতর জনপ্রিয়।
এই অনন্য মানবিক সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৫ সালের নভেম্বরে “গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস” (Guinness World Records) এবং লিমকা বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে (Limca Book of Records) নাম উঠেছে পলক মুছলের। পেয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার সহ নানা পুরস্কার। মানবতার সেবায় অবদানের জন্য, মাত্র ৯ বছর বয়সে পলককে ভারতের উপরাষ্ট্রপতি কৃষ্ণকান্ত ২০০০ সালে, জাতীয় শিশু পুরস্কার (রাষ্ট্রীয় বাল পুরস্কার) রৌপ্য পদকে ভূষিত করেন।
এমন কি, মানবসেবার জন্য মাত্র ২৯ বছর বয়সে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচিতে পলক মুছলের নাম অন্তুর্ভুক্ত হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষাবোর্ড (CBSF) এবং মহারাষ্ট্র বোর্ডের বিদ্যালয় স্তরের পাঠ্যপুস্তকে সঙ্গীতশিল্পী এবং সমাজকর্মী পলক মুছলের ((Palak Muchhal)) নাম ও তাঁর অবদানের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, ২০২১ সালে।
পাঠ্যসূচিতে পলক মুছলের জীবনের এই অধ্যায়টিতে কেবল তাঁর সঙ্গীত ক্যারিয়ার নয়, বরং অসুস্থ সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের হৃদরোগের চিকিৎসায় তহবিল সংগ্রহের জন্য সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের চিত্র বিশেষ ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশাল এই মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে গেছেন মানবতাবাদী জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী পলক মুছল। এমন নজির, শুধু ভারতবর্ষ নয়-পৃথিবীতে খুব কমই আছে।
তবে একদিনে এই অবস্থানে আসেননি পলক মুছল। খুব ছোটবেলা থেকেই, দুঃস্থ শিশুদের জন্য প্রাণ কাঁদত তাঁর। মাত্র সাত বছর বয়স থেকেই শিশুদের সাহায্য শুরু করেন পলক। শিশুশিল্পী হিসেবে ‘চ্যারিটি শো’তে গান গেয়ে মানুষকে মুগ্ধ করে অর্থ সংগ্রহ করতেন তিনি। তারপর, সেই অর্থ দিয়েই পলক সাহায্য করতেন দুঃস্থ শিশুদের।
বড় হওয়ার পরে, দুঃস্থদের পাশে আরো দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছেন পলক। বিভিন্ন বিষয়ে তিনি সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে দুঃস্থ শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সাহায্যের বিষয়টি তাঁর কাছে সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে।
কারণ, অনেক সময় শিশুদের এমন কোনো জটিল রোগ হয়, যে রোগের চিকিৎসা করার অর্থ থাকে না, তার পরিবারের কাছে। বিশেষ করে হার্ট সংক্রান্ত রোগ অনেক ব্যয়বহুল। সেই রোগের যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে অনেক সময় শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তাই এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সামাল দিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন পলক। তিনি কখনো প্রচার-প্রপাগাণ্ডায় বিশ্বাসী না। কিন্তু প্রচারযন্ত্র তাঁকে সব সময় অনুসরণ করে। কারণ, তাঁর এই মানবসেবা ভারতের সংগীত ও মানবতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
১৯৯২ সালের ৩০ মার্চ, ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ইন্দোর শহরের একটি ঐতিহ্যবাহী মাহেশ্বরী মাড়ওয়ারি পরিবারে পলক মুছল জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম রাজকুমার মুছল। তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে হিসাবরক্ষকের কাজ করতেন। আর তাঁর মায়ের নাম অমিতা মুছল। তিনি একজন গৃহিণী। তাঁরা একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। কিন্তু মানবসেবার মহান ব্রতের জন্য তাঁরা আজ শুধু ভারতবর্ষ নয়, সারা বিশ্বে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
পলকের ছোট ভাই পলাশ মুছল। ১৯৯৫ সালের ২২ মে তাঁর জন্ম। তিনি বলিউডের একজন সুপরিচিত সংগীত পরিচালক ও সুরকার। তিনি বড় বোন পলকের সঙ্গেই গান করেন এবং মানবতার সেবায় নিয়োজিত। তিনি তাঁর উপার্জিত অর্থ দিয়ে দরিদ্র ও অসহায় শিশুদের কিডনি সমস্যার চিকিৎসা করেন।
লেখক: সাংবাদিক,লেখক, সাহিত্যিক, গবেষক।
//L//

