রাজবাড়ী প্রতিনিধি
ইলিশের ভরা মৌসুমেও রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে দেখা মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশের। প্রতিদিন জাল ফেলেও ইলিশ না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন জেলেরা। ফলে ইলিশের ভরা মৌসুমেও রাজবাড়ীর পদ্মাপাড়ের জেলেদের মুখে হাসি নেই। নদীতে কাঙ্ক্ষিত মাছ না থাকায় সংসারের খরচ, ঋণের কিস্তি ও দাদনের টাকা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
দিনের পর দিন নদীতে জাল ফেলেও অনেক জেলেকে ফিরতে হচ্ছে সামান্য মাছ নিয়ে। কারও জালে উঠছে দুই-চারটি ইলিশ, আবার কারও জাল প্রায় খালিই থাকছে। অথচ ইলিশ ধরতে নদীতে নামার আগে জাল-দড়ি মেরামত, নৌকা প্রস্তুত, জ্বালানি কেনা এবং শ্রমিকের খরচ- সবই করতে হচ্ছে ধারদেনা, ঋণ কিংবা দাদনের টাকায়। মাছ না পাওয়ায় সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজবাড়ীর পাঁচ উপজেলার মধ্যে গোয়ালন্দ, পাংশা, কালুখালী ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা কোনো না কোনোভাবে পদ্মার সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে এসব এলাকার বহু পরিবার মাছ ধরা, মাছ বিক্রি ও নদীকেন্দ্রিক বিভিন্ন পেশার ওপর নির্ভরশীল।
ইলিশের মৌসুমে সাধারণত নদীতে জেলেদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পদ্মার বুকে চলে জাল ফেলার কাজ। কিন্তু এবার সেই ব্যস্ততার সঙ্গে নেই প্রত্যাশিত মাছের প্রাচুর্য।
জেলেরা বলছেন, দিনের পর দিন নদীতে জাল ফেলেও তেমন ইলিশ পাচ্ছেন না তারা। এতে নদীতে যাওয়ার খরচই উঠছে না অনেকের। পদ্মায় ইলিশের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনতে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; নদীর পরিবেশ ও নাব্যতা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।
তাদের মতে, নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, ডুবোচর ও নাব্যতা সংকট মোকাবিলা, ইলিশের বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং অবৈধ জাল ও ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরা বন্ধ করতে কার্যকর নজরদারি বাড়াতে হবে।
একদিকে নদীতে মাছের সংকট, অন্যদিকে জাল-নৌকা ও জ্বালানির খরচ- দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছেন জেলেরা। মাছ না পাওয়ায় আয় কমলেও খরচ কমেনি। ফলে অনেকের সংসার চলছে ধারদেনায়।
ইলিশ ধরার ওপর নির্ভরশীল জেলেদের জন্য মৌসুমের সময়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া না গেলে বছরের বাকি সময় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
জেলেরা বলছেন, মাছ ধরার জন্য আগে থেকেই তারা জাল-দড়ি প্রস্তুত করেন, নৌকা মেরামত করেন, জ্বালানি কেনেন এবং অনেক ক্ষেত্রে দাদনের টাকা নেন। কিন্তু নদীতে মাছ না থাকায় সেই বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসছে না। এ অবস্থায় সামনে নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে তাদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়বে। নদীতে মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।
পদ্মার জেলেদের কাছে ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়- এটাই তাদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। নদীতে ইলিশ থাকলে তাদের ঘরে স্বস্তি ফেরে, আর নদীতে মাছ না থাকলে সংসারে নেমে আসে অভাব।
জেলে গোপাল হলদার থেকে বাশুদেব হলদার, লাল চাঁদ- সবার কথাতেই উঠে এসেছে একই আক্ষেপ, ভরা মৌসুমে নদীতে ইলিশ নেই, কিন্তু সংসারের খরচ আছে, ঋণের কিস্তি আছে, দাদনের টাকা পরিশোধের চাপ আছে।
তাদের প্রত্যাশা, পদ্মায় আবারও ফিরবে ইলিশের প্রাচুর্য। জেলেদের জালে উঠবে রূপালি ইলিশের ঝাঁক। আর সেই মাছ বিক্রির আয়েই ঘুরবে তাদের সংসারের চাকা। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণে নদীর পরিবেশ, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষা এবং অবৈধভাবে মাছ ধরা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের পদ্মার পাড়ে দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাট সংলগ্ন সাত্তার মেম্বারপাড়া এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, ভরা মৌসুমেও জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না। নদীতে জাল ফেলেও অনেককে ফিরতে হচ্ছে সামান্য মাছ নিয়ে। ফলে ইলিশের ওপর নির্ভরশীল জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা ও আর্থিক অনিশ্চয়তা।
গোয়ালন্দের জেলে গোপাল হলদার বলেন, নদীতে পানি কম থাকায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। জাল-দড়ি ঠিক করতে এবং নৌকা চালাতে ঋণ করেছেন তারা। কিন্তু মাছ না পাওয়ায় সেই খরচও উঠছে না। ৮/১০জন লোক নিয়ে নৌকা চালাই। কিন্তু মাছ এত কম যে নৌকার খরচই উঠে না। খাওন-দাওনের খরচও চলে না। টুকটাক যা মাছ পাই, তা দিয়েই কোনোভাবে জীবনযাপন করছি। খুব কষ্টে আছি আমরা।
আরেক জেলে লাল চাঁদ বলেন, ভরা মৌসুমেও জালে কাঙ্ক্ষিত মাছ উঠছে না। একটা জাল বা খেও দিলে পরে চারটা-পাঁচটা, কখনো দুইটা মাছ আসছে। কম থাকার কারণে বাড়িতে টাকা পাঠানোরও সামর্থ্য হচ্ছে না।
লাল চাঁদের দাবি, মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, মাছ না থাকলে জেলেদের আয়ও থাকে না। যা পাই, তা দিয়ে বাড়ির খাওয়া-দাওয়া চালাই। বাড়িতে দেওয়ার মতো টাকা থাকে না। করজ-উধার করে খেতে হয়। কোনোদিন আল্লাহ দুইটা মাছ দিলে এক-দুই হাজার টাকা বাড়িতে পাঠাই। এভাবেই খুব কষ্টের মধ্যে চলছে। তার মতে, নদীর পানি কমে চারদিকে ছড়িয়ে যাওয়ায় ইলিশের বিচরণও কমেছে।
ইলিশ বিক্রেতা মিলন বলেন, এবার গত বছরের তুলনায় ইলিশের পরিমাণ অনেক কম। পদ্মার এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। দেড় কেজি ওজনের ইলিশের দাম উঠছে প্রায় ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত।

