২০২৬ সালের এএইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে আজ ৩১ অক্টোবর শনিবার। ফলাফলে সার্বিক পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। তাই এই ফলাফল নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাঙ্গনে তীব্র আলোচনা, সমালোচনা ও উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে।
এ বছর পরীক্ষায় গড় পাসের হার মাত্র ৫২.১২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪০,০৮৪ জন শিক্ষার্থী। গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৯ হাজার কম। গত বছর জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৬৯,০৯৭ জন। শুধু তাই নয়, আরো দুঃখজনক বিষয় হলো, এ বছর দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি।
এবারের ফলাফল গত ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। এটা শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা, নাকি শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
তবে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার যে ফল প্রকাশিত হয়েছে, তাকে শুধু খারাপ ফলাফল বলা ঠিক হবে না। বরং এটাকে আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকটের একটি অনিবার্য প্রতিফলন হিসেবে দেখতে হবে।
এ বছর গড় পাসের হার যেমন নেমে এসেছে। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর হারও প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, দেশের প্রায় ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস না করার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা দেখেছি, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য এক ধরণের অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল। করোনা মহামারীর সময় সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও বিশেষ মূল্যায়নের পর, এ বছর যখন পূর্ণাঙ্গ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা ও খাতা মূল্যায়ন হলো, তখনই এই শিক্ষার ত্রুটির প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে এলো।
আসলে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান সমস্যা, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষার্থীদের শিখন পদ্ধতিতে ঘাটতি রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এসব সমস্যা যথাযথভাবে সমাধান করা হয়নি। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে কী শিখছে এবং পরীক্ষায় কী লিখছে—তার মধ্যে এক বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই ফলাফলকে ‘সন্তোষজনক নয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যবস্থায় যে ঘাটতি রয়েছে, তা তিনিও স্বীকার করেছেন। তবে তিনি এক ও দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এক মাসের মধ্যে পুনর্বিচ্ছেচনামূলক বা নতুন পরীক্ষার ব্যবস্থার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। তবে, এটা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ঢালাওভাবে পাসের হার বাড়ানো বা নিয়ম শিথিল করে কৃত্রিমভাবে সন্তোষজনক ফল দেখানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে যে ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন কোনো শিক্ষার্থী পাস করে নি, তাদের শিক্ষাদানের মান কেমন ছিল, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
আমরা মনে করি, শিক্ষার এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণে কেবল শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের দোষারোপ না করে, শিক্ষা প্রশাসনকে সমস্যা খুঁজে বের করতে হবে। মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং এবং শ্রেণিকক্ষে পড়ালেখার উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। প্রতি বছর পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশা প্রকাশ করলে হবে না। দেশের কল্যাণময় ভবিষ্যত গড়তে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও উন্নয়ন অত্যাবশ্যক।

