শারদীয় দুর্গোৎসব। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ও প্রধান ধর্মীয় উৎসব। অশুভ ও অপশক্তি দমন ও শুভশক্তির বিজয় কামনা করা এবং সত্য ও সুন্দরের আরাধনা সহ সর্বজীবের মঙ্গলসাধন করাই হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল চেতনা।
দুর্গাপূজার মূল দর্শন হলো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের বিজয়। ঘৃণা ও বিভেদের বিরুদ্ধে ভালোবাসার জয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয়।
দুর্গাপূজার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, অশুভ ও আসুরিক শক্তি দমন করে সমাজে ন্যায়বিচার, সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। একইসঙ্গে সব মানুষের সমঅধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা, মানুষে মানুষে বৈষম্য ও ভেদাভেদ দূর করা।
শুধু তাই নয়- অন্যায়, অবিচার প্রতিরোধ ও অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানিমুক্ত অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার প্রত্যয় ঘোষণা করে এই উৎসব। একইসঙ্গে প্রেম, ভক্তি ও সহনশীল মানবিক সমাজ গঠন করার শিক্ষা দেয় এই উৎসব।
তাই শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়, এটি আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী এক উৎসব। এই উৎসব সমাজ থেকে সকল অসহিষ্ণুতা ও বিভেদ দূর করে মানুষে মানুষে অনাবিল আনন্দ, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের বন্ধন সুদৃঢ় করার প্রেরণা জোগায়।
এই উৎসব সংঘাতের বিপরীতে সংহতি, অবিশ্বাসের বিপরীতে বিশ্বাস, সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে অসাম্প্রদায়িকতা, হিংসার বিপরীতে প্রেম, জিঘাংসার বিপরীতে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়। আজকের সমাজ ও দৈশিক বাস্তবতায় এই দর্শন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তাই ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’—এই চেতনা হৃদয়ে ধারণ করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী-নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণে শারদীয় দুর্গোৎসব পালিত হয়। ফলে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় নয়, একটি সর্বজনীন সামাজিক আনন্দ উৎসবও বটে। ঐক্য ও সমন্বয়ের প্রতীক হিসেবে, এ উৎসবের আনন্দযজ্ঞে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ যোগ দেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে. কে এই দেবী দুর্গা? সকল বিপদ থেকে যিনি রক্ষা করেন, জগতের কল্যাণ সাধন করেন ও মানুষের দুঃখকষ্ট দূর করেন, তিনিই হচ্ছেন দেবী দুর্গা। তিনি আদ্যাশক্তি, মহামায়া, শিবানী, ভবানী, দশভুজা, চণ্ডী, নারায়ণী প্রভৃতি নামে অভিহিত হন।
পুরাণে বলা হয়েছে, আদ্যাশক্তি মহামায়া দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন ও সমগ্র জীবের কল্যাণে যুগে যুগে বিভিন্ন রূপে ভিন্ন ভিন্ন নামে আবির্ভূত হন। দেবী দুর্গা মহামায়ারই বিশেষ সময়ের, বিশেষ যুগের, বিশেষ রূপ। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ে মা দুর্গার মর্ত্যে আবির্ভাব ঘটে।
দুর্গা আসলে অসুররূপী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। নারী শক্তির জাগরণের প্রতীক। দুর্গার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয় নারীর মাতৃত্বের অহংকার। তিনিই বিজয়া। জগৎজননী। তাঁর সঙ্গে আনন্দ ও জয়ের যোগ অভিন্ন।
শত শত বছর ধরে দুর্গোৎসব বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। একসময় এই উৎসব কলকাতা সহ বিভিন্ন জমিদার বাড়ির অন্দরমহল বা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সময়ের পরিক্রমায় দুর্গাপূজা আজ বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
দুর্গাপূজা ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি লাভ করেছে, যা বাংলা ভাষাভাষী ও বাঙালি সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের জন্য এক বিরাট গৌরবের বিষয়।
দুর্গাপূজা যদিও হিন্দু সম্প্রদায়ের, কিন্তু মূলবাণী সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে নিবেদিত। এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা। দুর্গোৎসবে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এক সামাজিক বন্ধন ও অসাম্প্রদায়িক পরিচয় ফুটে ওঠে, ভ্রাতৃত্ববোধের এক নতুন আবহ সৃষ্টি করে।
দেবী বন্দনার উদ্দেশ্য হলো অন্তরে-বাহিরে আসুরিক শক্তির বিনাশ। দুর্গাপূজা হচ্ছে শক্তির আরাধনা। দেবীর ‘১০ হাত’ ঐক্য বা সম্মিলিত শক্তির প্রতীক। ঐক্যবদ্ধভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ও অন্যায়কে প্রতিহত করার শিক্ষা দেয় দুর্গাপূজা। সুতরাং দুর্গাপূজা শক্তি, সংহতি ও ঐক্যের প্রতীক।
দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। আমাদের অর্থনীতি ও সৃজনশীল শিল্পেও দুর্গাপূজা বড় ভূমিকা রাখে। প্রতিমা শিল্পী, প্যান্ডেল কারিগর, আলোকশিল্পী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এই সময়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দুর্গাপূজায় উৎসবমুখর পরিবেশে কোটি কোটি টাকার জামা কাপড় ও গহনাসহ নানা পণ্য কেনা বেচা হয়। পূজায় খাওয়া দাওয়া চলে দেদার, গিফ্ট বিনিময় হয় প্রচুর। যা আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
দুর্গাপূজা সর্বজনীন উৎসব। দেবী দুর্গা মৃণ্ময়ী প্রতিমায় সপরিবারে পূজিত হন। মা দুর্গার সঙ্গে সিদ্ধিদাতা গণেশ, মহাবীর দেবসেনা কার্তিক, ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মী ও বিদ্যার দেবী সরস্বতী পূজিত হন। দেবাদিদেব মহাদেবের স্থান থাকে সবার ওপরে। দুর্গা দেবীর সঙ্গে তাঁর বাহন সিংহ, গণেশের বাহন ইঁদুর, কার্তিকের বাহন ময়ূর, লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা, সরস্বতীর বাহন হংস, এমনকি মহিষাসুরও পূজিত হন। উঁচু-নিচু-স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য সবাই দুর্গাপূজায় পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করেন।
পূজার পর শুভ বিজয়া। বিজয়া সব মানুষের মিলন মেলা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষ একত্রে বিজয়ার উৎসব পালন করেন। বিজয়া উৎসব বা বিজয়া দশমী হলো শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপনী ও শ্রেষ্ঠ দিন। অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক হিসেবে এই দিনটি উদযাপন করা হয়।
শারদীয় দুর্গোৎসবের আলোয় উদ্ভাসিত হোক মানব হৃদয়। প্রতিষ্ঠিত হোক নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ। যেখানে প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। উৎসব হোক সত্যিকার অর্থেই সর্বজনীন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন অটুট হোক। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় হোক। বিবেকবান, সাহসী ও মানবতাবাদী মানুষ ঐক্যবদ্ধ হোক। শুভ হোক দুর্গোৎসব। শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রত্যাশা সফল হোক।
শারদীয় দুর্গোৎসব শুভশক্তির বিজয়ের প্রেরণা
4 Mins Read
সম্পাদকীয়

