দ্যুতিময় বুলবুল:সনাতন ধর্মীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাঙালিদের শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা। দুর্গা হলেন, হিন্দুদের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পরম আরাধ্য দেবী। তাঁকে আদ্যাশক্তির এক রণরঙ্গিনী মহাদেবী হিসেবে গণ্য করা হয়। বলা হয়, তিনি পরমা প্রকৃতি ও সৃষ্টির আদি কারণ।
দেবী দুর্গা দেবাদিদেব মহাদেব তথা শিবের স্ত্রী পার্বতীর উগ্র রূপ। তিনি কার্তিক ও গণেশের মা। তাঁর আরেক জনপ্রিয় রূপ কালী। বাংলার মঙ্গলকাব্যে এবং আগমনী গানে হিমালয়ে আশ্রমবাসী ঋষি কাত্যায়ন কন্যা রূপে মর্ত্যে আবির্ভূতা দেবী দুর্গার বর্ণনা পাওয়া যায়।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস, দেবী দুর্গা দুর্গতিনাশিনী। তিনি ভক্তদের সংকটমুক্ত করেন। তিনিই দেবতাদের অনুরোধে দুর্গম নামক এক অসুরকে বধ করেছিলেন। তাই তাকে দুর্গা নামে অভিহিত করা হয়। দুর্গা নামেই তিনি অধিক পরিচিত। এই নামেই তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পূজিতা। তবে-যিনি দুর্গা, তিনিই পার্বতী, তিনিই কালী।
শাস্ত্রমতে, দুর্গা হলেন নিরাকার ঈশ্বরের একটি দৈহিক ও মানবিক রূপ। যেমন কৃষ্ণ নিরাকার ঈশ্বরের দৈহিক ও মানবিক রূপ। তাই দুর্গাকে পরব্রহ্ম পরমেশ্বরী বলা হয়। আর কৃষ্ণকে বলা হয় পরব্রহ্ম পরমেশ্বর।
শুধু দুর্গা ও কৃষ্ণ নয়- শিব, বিষ্ণু, রাম সবাই একই ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যমান রূপ। আসলে তারা এক ও অভিন্ন সত্ত্বা। এক এক সময়ে ঈশ্বরের এক এক রূপ। প্রত্যেকটি রূপই ভিন্ন, কিন্তু বাস্তবে সবই একই সত্ত্বা।
শাস্ত্রমতে, ঈশ্বর এক। তিনি নিরাকার। তিনি যুগে যুগে নানা দৃশ্যমান রূপ ধারণ করেন। মূলত, একই অঙ্গে অনেক রূপ। তাই সময়ের প্রয়োজনে ঈশ্বরের রূপগুলো ভিন্ন কিন্তু তিনিই পরমসত্ত্বা।
ঈশ্বরের এক রূপ যদি অন্য রূপের পূজা করে, তবে তিনি নিজের আদি সত্ত্বাকেই ভিন্ন রূপে পূজা করেন। তাই রাম কিংবা কৃষ্ণ যখন জগদম্বা দুর্গার পূজা করেন, তখন তারা নিজেদের আদি রূপকে স্মরণ করেন। মূলত, শিব, দুর্গা, রাম, কৃষ্ণ একই সত্ত্বার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ।
দুর্গা নামের বুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে, যিনি দুর্গ অর্থাৎ দুর্গতি থেকে মুক্ত করেন, তিনিই দুর্গা। শাস্ত্রে ‘দুর্গা’ শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, দুর্গার ‘দ’অক্ষর দৈত্যনাশক, ‘উ’-কার বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’রোগনাশক, ‘গ’পাপনাশক এবং ‘আ-কার’ শত্রুনাশক। অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা।
হিন্দু পুরাণে অসুররাজ মহিষাসুর ও দেবী দুর্গার যুদ্ধের কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। অবশ্য গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের ঘটনা আসলে আর্য-অনার্যদের লড়াইয়ের কাহিনি। তাদের দাবি, মহিষাসুর ছিলেন অত্যন্ত বলশালী এবং প্রজাবৎসল এক রাজা। আর্যরা এই স্থানীয় অনার্য রাজার সঙ্গে যুদ্ধে বারবার পরাজিত হলে, এক গৌরবর্ণা নারী তাকে হত্যা করেন। তাই দুর্গাকে গৌরীও বলা হয়। তবে অনেক গবেষকের দাবি, আর্যদের ভারতবর্ষে আসার বহু আগেই দুর্গা মহিষাসুর বধ করেন।
অবশ্য বেদ, পুরাণ, উপনিষদে ছড়িয়ে রয়েছে দুর্গা কাহিনি। সেখানে বলা হয়েছে, দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ হচ্ছে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির লড়াইয়ের ইতিহাস। হিন্দু পুরাণ মতে, মহিষাসুর ছিলেন রম্ভাসুরের পুত্র এবং ব্রহ্মর্ষি কশ্যপের প্রপৌত্র। বিভিন্ন প্রাচীন হিন্দু কাহিনিতে মহিষাসুরকে অপদেবতা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেবী দুর্গার সৃষ্টি সম্পর্কে শ্রীশ্রী চণ্ডীতে বলা হয়েছে যে, ব্রহ্মা অসুররাজ মহিষাসুরের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বর দিয়েছিলেন যে, কোনো পুরুষ তোমাকে বধ করতে পারবে না। তবে এক নারীর হাতে তোমার মৃত্যু হবে। মহিষাসুর নারীশক্তিকে অবজ্ঞা করেন এবং ব্রহ্মার দেয়া বরকে অমরত্ব ভেবে বেপরোয়া হয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। তিনি স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করেন এবং যুদ্ধে দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করেন।
দেবরাজ ইন্দ্র সহ দুর্দশাগ্রস্থ দেবতারা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের শরণাপন্ন হলে-তারা স্বর্গরাজ্য উদ্ধার করার লক্ষ্যে মহিষাসুরকে বধ করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই মোতাবেক ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব ও দেবতাদের সম্মিলিত তেজের সঙ্গে দেবী পার্বতী, সরস্বতী ও লক্ষ্মী নব-কলেবরে একই দেহে লীন হলে-হিমালয়ের পাদদেশে পুণ্যসলিলা গঙ্গার তীরে ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে দশদিক আলোকিত করে দেবী দুর্গা কাত্যায়নী নামে আবির্ভূতা হন। মর্ত্যে আবির্ভূত হওয়ার পর দেবী বলেছিলেন, “আমি ঋষি কাত্যায়নের কন্যা দেবী কাত্যায়নী। আমিই মহাদেবীর অবতার দুর্গা রূপে অশুভকে বিনাশ করার জন্য জন্ম নিয়েছি।”
ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব ও দেব-দেবীদের সম্মিলিত শক্তি এবং অস্ত্রসম্ভারে বলিয়ান, অপরিমেয় নারীশক্তির আধার আদ্যাশক্তির অপরাজিতা রণরঙ্গিনী মহাদেবী দুর্গাকে দেবী কাত্যায়নীরূপে শুক্লা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিথিতে ঋষি কাত্যায়ন পূজা করেন। দশমীতে দেবী দুর্গা চণ্ডিকা রূপে মহিষাসুরকে এবং কালী রূপে রক্তবীজকে বধ করেন।
পুরাণ মতে, মহিষাসুর বধের জন্য দুর্গা দশভূজারূপে আবির্ভূত হন। দেবতাদের সব দুর্গতি বিনাশ করার জন্য দুর্গা দুর্গতিনাশিনী, মহিষমর্দিনী এবং অসুরদলনী নামেও পরিচিত। পুরাকালে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল বসন্তকালে। এ সময় দেবী দুর্গা ‘বাসন্তী’ নামে পূজিত হতেন, যার প্রচলন এখনও আছে।
দেবী দুর্গার আরাধনা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এছাড়া আসাম, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড এবং বিহারের কোনো কোনো অঞ্চলে প্রচলিত। ভারতের অন্যত্র দুর্গাপূজা মূলত নবরাত্রি ব্রত রূপে উদযাপিত হয়।
তবে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। উনিশ শতকের পরাধীন ভারতবর্ষে এই পূজা আক্ষরিক অর্থেই সর্বধর্ম সমন্বয়ের উৎসব মঞ্চ হয়ে উঠেছে। সেই থেকে জাতি-ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে, আজকের বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষের মানুষ দুর্গাপূজায় মেতে ওঠে উৎসবের আনন্দে।
তবে কীভাবে দুর্গাপূজা ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের চেতনার প্রতীক ও প্রেরণা এবং বাংলা-ভারতের জনগণের মিলনমেলা হয়ে উঠল, তার উত্তর পেতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের দিকে। (চলবে)
দ্যুতিময় বুলবুল: লেখক, সাংবাদিক, গবেষক।
দুর্গা সংগ্রামের প্রতীক ও প্রেরণা
4 Mins Read
মতামত/সাক্ষাৎকার

