শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
ঋত্বিক ঘটক—নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিষণ্ন বাংলার ছবি। দূরে মেঘ জমে, নদীর বুকে নেমে আসে ধূসর সন্ধ্যা, আর বাতাসে ভেসে বেড়ায় হারিয়ে যাওয়া কোনো ঠিকানার দীর্ঘশ্বাস। মনে হয়, বাংলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া কোনো অদৃশ্য নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছেন এক মানুষ। হাতে ক্যামেরা, চোখে জমে আছে ইতিহাসের ক্ষত। তিনি শুধু চলচ্চিত্র নির্মাতা নন, এক ভাঙা ভূখণ্ডের আর্তনাদের ভাষ্যকার।
তিনি ঋত্বিক কুমার ঘটক। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী স্রষ্টা। তাঁর চলচ্চিত্রে ব্যক্তিগত বেদনা, দেশভাগের অভিঘাত, মানুষের অস্তিত্বসংকট ও হারানো শেকড়ের আকুতি মিশে গেছে এক অনন্য শিল্পভাষায়। তাঁর শিল্পীসত্তার শেকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় রাজশাহীতে—পদ্মার পাড়ে, মিয়াপাড়ার সেই পুরোনো জনপদে।
১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঋত্বিক ঘটকের জন্ম। জন্মস্থান নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য থাকলেও রাজশাহীর মিয়াপাড়ার সঙ্গে তাঁর শৈশব, কৈশোর ও বেড়ে ওঠার সম্পর্ক সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁর বাবা সুরেশচন্দ্র ঘটক ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, কবি ও নাট্যকার। বাবার কর্মসূত্রে পরিবারটি রাজশাহীতে বসবাস করত।
তখনকার রাজশাহী ছিল শান্ত, ছায়াঘেরা এক জনপদ। শহরের একদিকে বরেন্দ্রভূমির প্রাচীন ইতিহাস, অন্যদিকে পদ্মার বিস্তৃত জলরাশি। গ্রীষ্মে নদীর বুকে জেগে উঠত চর, বর্ষায় ফুলে উঠত জল, শরতে নীল আকাশের নিচে নদীর বুকে ভেসে বেড়াত সাদা মেঘ। বিকালের আলোয় পদ্মার পাড়ে দাঁড়ালে দূরের জলরেখা মিলিয়ে যেত দিগন্তে।
এই প্রকৃতির কাছেই কেটেছে ঋত্বিকের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। তিনি পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও রাজশাহী কলেজে। কলেজজীবনে সাহিত্য, নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়। নাট্যচর্চা, সাহিত্যপাঠ এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তাঁর সৃজনশীল মননকে সমৃদ্ধ করে। রাজশাহীর মিয়াপাড়া সাধারণ পাঠাগারের মাঠেও নাট্যচর্চার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সে সময় তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘অভিধারা’ নামের একটি পত্রিকা।
পদ্মার জল, নদীতীরের জনজীবন, বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রকৃতি এবং রাজশাহীর সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর অনুভূতির জগৎকে সমৃদ্ধ করেছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর চলচ্চিত্রে নদী, প্রকৃতি, লোকজ জীবন ও মানুষের বিচ্ছেদের যে গভীর উপস্থিতি দেখা যায়, তার সঙ্গে এই শৈশব-কৈশোরের অভিজ্ঞতার সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
রাজশাহী তাঁর কাছে কেবল বেড়ে ওঠার শহর ছিল না; ছিল শেকড়ের ঠিকানা। যে পদ্মার তীরে তাঁর শৈশবের স্মৃতি, সেই নদীর জলধারাই যেন পরবর্তী জীবনে তাঁর চলচ্চিত্রের নান্দনিকতায় ফিরে এসেছে বারবার।
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সঙ্গে জন্ম নেয় এক গভীর বিভাজন। মানচিত্রে টানা হয় নতুন সীমান্ত। কিন্তু কাঁটাতারের সেই রেখা শুধু ভূখণ্ডকে আলাদা করেনি, বিচ্ছিন্ন করেছিল মানুষের শেকড়, আত্মীয়তা, স্মৃতি ও ভালোবাসাকে। দেশভাগের অভিঘাতে ঋত্বিক ও তাঁর পরিবারকে রাজশাহী ছেড়ে ভারতে চলে যেতে হয়। পদ্মার তীর, মিয়াপাড়ার বাড়ি, পরিচিত পথঘাট, শিক্ষাজীবনের স্মৃতি—সবকিছু পেছনে ফেলে শুরু হয় নতুন জীবনের সংগ্রাম। কলকাতায় তখন পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তু মানুষের ঢল। রেলস্টেশন, ফুটপাত, কলোনি আর অস্থায়ী আশ্রয়ে গড়ে উঠছিল নতুন জীবন। মানুষের চোখে ছিল হারানো ভিটের স্মৃতি, হাতে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
ঋত্বিক বুঝেছিলেন, উদ্বাস্তু হওয়া মানে শুধু বাসস্থান হারানো নয়; হারিয়ে ফেলা নিজের ভাষার একটি বিশেষ সুর, পরিচিত সংস্কৃতি, আত্মীয়তার বন্ধন এবং আত্মপরিচয়ের একটি অংশ।
তাঁর চলচ্চিত্রে দেশভাগ তাই কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি মানুষের অস্তিত্বে নেমে আসা দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়।
ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রযাত্রার শুরু সাহিত্য, নাটক ও গণনাট্য আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, শিল্প মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। শিল্পের কাজ শুধু সৌন্দর্য সৃষ্টি করা নয়, সমাজের অসংগতি ও মানুষের দুঃখকেও দৃশ্যমান করা। ১৯৫২ সালে নির্মাণ করেন ‘নাগরিক’। জীবদ্দশায় সিনেমাটি মুক্তি পায়নি; ১৯৭৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর মুক্তি পায়। এরপর ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮) ও ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৯) চলচ্চিত্রে তিনি মানুষের জীবন, আধুনিকতার সংকট এবং শিশুমনের বিস্ময় তুলে ধরেন।
তাঁর চলচ্চিত্রের ভাষা ছিল প্রচলিত ধারার বাইরে। ক্যামেরা, সম্পাদনা, লোকসংগীত, শাস্ত্রীয় সংগীত, আকস্মিক শব্দ ও নীরবতাকে তিনি ব্যবহার করতেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। কখনো ট্রেনের শব্দ হয়ে উঠত বিচ্ছেদের প্রতীক, কখনো পাহাড়ের প্রতিধ্বনি বহন করত মানুষের অন্তর্গত আর্তনাদ। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০) তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। উদ্বাস্তু পরিবারের মেয়ে নীতা সংসারের সবার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিজের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও সুখ বিসর্জন দেয়। তার বিখ্যাত আর্তনাদ—‘দাদা, আমি বাঁচতে চাই’ —শুধু একজন নারীর বেঁচে থাকার আকুতি নয়; দেশভাগের পর বিপর্যস্ত একটি সমাজের সম্মিলিত কান্না।
‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) চলচ্চিত্রে তিনি দেশভাগের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তুলে ধরেছেন। নাট্যদলের সদস্য ভৃগু ও অনসূয়ার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে বিভক্ত বাংলার শিল্পীসমাজের সংকট। তাঁর কাছে বাংলা ছিল একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক সত্তা, যা রাজনৈতিক সীমারেখায় আটকে থাকার কথা নয়। ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২ সালে নির্মিত, ১৯৬৫ সালে মুক্তি) চলচ্চিত্রে উদ্বাস্তু জীবনের অনিশ্চয়তা আরও নির্মম হয়ে ওঠে। ঈশ্বর, সীতা ও অভিরামের জীবনকাহিনিতে উঠে আসে শ্রেণিবৈষম্য, জাতপাত, পরিচয়ের সংকট ও মানবিক সম্পর্কের ভাঙন। এই তিন চলচ্চিত্র একত্রে পরিচিত ঋত্বিক ঘটকের দেশভাগের ত্রয়ী হিসেবে। তিনটি ছবির গল্প আলাদা হলেও অন্তর্গত সুর এক—শেকড় হারানোর বেদনা, পরিচয়ের সংকট এবং মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে। তিতাস এখানে শুধু একটি নদী নয়; এটি একটি জনপদের জীবন, সংস্কৃতি, জীবিকা ও অস্তিত্বের প্রতীক। নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা মালো সম্প্রদায়ের জীবনসংগ্রাম, প্রেম, বিচ্ছেদ, দারিদ্র্য এবং ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকা সামাজিক ঐতিহ্য চলচ্চিত্রটির মূল উপজীব্য। এক সময় যে নদীর বুকে নৌকার পাল উড়ত, জেলেদের জালে উঠত রুপালি মাছ, ঘাটে ঘাটে জমত মানুষের গল্প, সময়ের প্রবাহে সেই নদীই হয়ে ওঠে নিঃস্বতার প্রতীক।
তিতাসের গল্প বলতে গিয়ে ঋত্বিক যেন নিজের হারানো জন্মভূমির কাছেই ফিরে গেছেন। পদ্মার পাড়ে ফেলে আসা শৈশবের স্মৃতি আর তিতাসের নদীতীরের মানুষের জীবন যেন তাঁর শিল্পীসত্তায় একাকার হয়ে যায়। জন্মভূমির সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার বেদনা তাঁর এই চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
ঋত্বিক ঘটকের ব্যক্তিজীবনও ছিল নানা টানাপোড়েনে ভরা। আর্থিক অনিশ্চয়তা, চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক ব্যর্থতা, পারিবারিক দূরত্ব এবং ব্যক্তিগত হতাশা তাঁকে বিপর্যস্ত করেছে। মদ্যপানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামও জীবনের শেষ অধ্যায়কে কঠিন করে তোলে। ১৯৭৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। এখানে নীলকণ্ঠ চরিত্রের মধ্যে যেন শিল্পীর আত্মজিজ্ঞাসা, ক্ষোভ, হতাশা ও সময়ের সঙ্গে বোঝাপড়ার প্রতিফলন ঘটেছে। ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় মাত্র ৫০ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। জীবদ্দশায় সব চলচ্চিত্র প্রাপ্য স্বীকৃতি পায়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর শিল্পের গুরুত্ব নতুনভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে। ভারতীয় সমান্তরাল চলচ্চিত্রের বিকাশে তাঁর প্রভাব আজও গভীর।
ঋত্বিক ঘটককে স্মরণ করতে গেলে রাজশাহীকে আলাদা করে স্মরণ করতে হয়। কারণ এই শহরেই তাঁর শৈশবের স্মৃতি, শিক্ষাজীবন এবং শিল্পী হয়ে ওঠার প্রাথমিক প্রস্তুতি। মিয়াপাড়ার যে বাড়িতে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে, সেটি সংরক্ষণের দাবি বহুদিন ধরেই উঠেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাড়িটির বড় অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। একসময় যে বাড়ির উঠোনে শৈশবের দিনগুলো কেটেছিল, যে শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাহিত্য ও নাটকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় গভীর হয়েছিল, সেই স্মৃতির ঠিকানাই আজ প্রায় বিলুপ্ত।
পদ্মা এখনো রাজশাহীর পাশ দিয়ে বয়ে যায়। বর্ষায় তার জল বাড়ে, শীতে নদীর বুকে চর জাগে। সন্ধ্যার আকাশে সূর্য ডুবে গেলে নদীর জলরেখায় ছড়িয়ে পড়ে বিষণ্ন আলো। অথচ সেই নদীর তীরেই একদিন বেড়ে উঠেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনন্য নির্মাতা।
ঋত্বিক ঘটক তাঁর ভেতরে ধারণ করেছিলেন একটি সময়ের বিষ। সেই বিষকে তিনি সেলুলয়েডে রূপান্তর করেছিলেন মানুষের ইতিহাসে। তাঁর ক্যামেরায় নীতা শুধু একজন উদ্বাস্তু নারী নন, সীতা শুধু একটি ট্র্যাজেডির চরিত্র নন, তিতাস শুধু একটি নদী নয়। তারা প্রত্যেকেই একটি ভাঙা বাংলার প্রতিচ্ছবি। তাই ঋত্বিক নামটি উচ্চারণ করলে আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে পদ্মার তীর, রাজশাহীর মিয়াপাড়া, হারিয়ে যাওয়া শৈশব, দেশভাগে বিচ্ছিন্ন মানুষের মুখ আর নদীর ওপারে ফেলে আসা ঘর।
//L//

