নিজস্ব প্রতিবেদক
আধুনিক নিবিড় কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মিলিত প্রভাবে বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্যের পুষ্টিগুণ দিন দিন কমতে কমতে ক্রমান্বয়ে তলানিতে ঠেকছে।
গত কয়েক দশকে উৎপাদনমুখী চাষাবাদের কারণে শস্যের ফলন ও আকার বাড়লেও চাল, গম ও সবজিতে জিংক, আয়রন ও প্রোটিনের মতো জরুরি অণুপুষ্টির ঘনত্ব ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে পেট ভরা খাবার পেয়েও প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের অভাবে কোটি কোটি মানুষ এক মারাত্মক ‘প্রচ্ছন্ন ক্ষুধা’ বা অদৃশ্য অপুষ্টির শিকার হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য নীতিনির্ধারকদের সামনে এক নতুন বৈশ্বিক সংকট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
যুক্তরাজ্যের অলাভজনক বিজ্ঞান সংস্থা ডিপ সায়েন্স ভেঞ্চারস (ডিএসভি) এবং মার্ক লিওনার্ড ট্রাস্ট-এর যৌথ উদ্যোগে ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত ‘হলো হারভেস্ট’ (ফাঁপা ফসল) নামক একটি বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
এই প্রতিবেদনের পূর্ণ শিরোনাম হলো: ‘হলো হারভেস্ট: রিবিল্ডিং দ্য নিউট্রিশনাল ভ্যালু অব ক্রপস ইন অ্যান এজ অব আবান্ড্যান্ট ক্যালোরিজ’ (ফাঁপা ফসল: প্রচুর ক্যালোরির যুগে ফসলের পুষ্টিমান পুনর্গঠন)।
নেদারল্যান্ডসের লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৬ সালের একটি সাম্প্রতিক মেটা-অ্যানালাইসিসে ৪৩টি খাদ্যশস্যের প্রায় ৬০ হাজারটি পুষ্টিগত পরিমাপ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে উদ্ভিদে শর্করা ও ক্যালোরির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু প্রোটিন, জিংক ও আয়রনের মতো খনিজ গড়ে ৩.২ শতাংশ কমে যাচ্ছে। এমনকি কিছু বিশেষ ফসলে জিংকের পরিমাণ ৩৭.৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে।
সাম্প্রতিক এই গবেষণাগুলোর ভয়াবহ তথ্য কৃষি ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক নিবিড় কৃষি পদ্ধতি, উচ্চ ফলনশীল জাতের একচেটিয়া চাষাবাদ এবং তীব্র জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রধান প্রধান খাদ্যশস্যের পুষ্টির মান ও ঘনত্ব (নিউট্রিয়েন্ট ডেনসিটি) আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
গত কয়েক দশকে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শস্যের গুণগত মানের চেয়ে পরিমাণের ওপর বেশি জোর দেওয়ায় উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদিত খাদ্যের পুষ্টিগুণ ক্রমান্বয়ে তলানিতে ঠেকছে। ফলে পেট ভরার মতো পর্যাপ্ত খাবার বা ক্যালোরি পেলেও প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের অভাবে কোটি কোটি মানুষ ‘প্রচ্ছন্ন ক্ষুধা’ বা তীব্র অণুপুষ্টির ঘাটতির (মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ডেফিসিয়েন্সি) শিকার হচ্ছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুষ্টি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই সংকটের রূপ আরও স্পষ্ট। সর্বশেষ ‘জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সার্ভে’-র তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ শিশু এবং ৫৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী তীব্র জিংক বা দস্তার ঘাটতিতে ভুগছেন।
প্রধান খাদ্য হিসেবে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল বা ভাত খাওয়া সত্ত্বেও মানুষের শরীরে জিংক ও আয়রনের মতো অত্যাবশ্যকীয় খনিজের এই ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। মূলত প্রথাগত উচ্চ ফলনশীল সাদা চালের পুষ্টি ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসের অভাবই এর অন্যতম প্রধান কারণ।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)-এর দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ডোনাল্ড ডেভিস ও তার দল ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, ১৯৫০ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে উৎপাদিত ৪৩টি বিভিন্ন ফসলে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ভিটামিন সি এবং প্রোটিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
কৃষিবিজ্ঞানীরা একে ‘ডিলিউশন ইফেক্ট’ বলছেন; যেখানে আধুনিক শস্যের আকার ও ফলন বাড়লেও পুষ্টির ঘনত্ব আনুপাতিক হারে কমে যাচ্ছে।
সূত্র:বাসস
//L//

