সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল অংশ না নিলেও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে এ কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেছেন, বিরোধী দলকে বারবার কমিটিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা এখনো প্রতিনিধি দেয়নি। তবে তাদের জন্য আলোচনার সুযোগ খোলা রয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির সপ্তম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমদ এসব কথা বলেন।
এদিন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সাবেক উপাচার্য, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করেছে কমিটি।
সেখানে সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার সীমা, জনগণের সার্বভৌমত্ব, মৌলিক অধিকার এবং সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে আলোচনা হয়।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের হাল ধরা মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রসংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ গ্রহণ করে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একইদিন গণভোট হয়।
গণভোটের রায় কার্যকরে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা থাকলেও বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীরা শুধু সংসদ সদস্যের শপথ নেন। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের বিজয়ীরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন।
বিরোধী দলের আপত্তির মুখে সরকারি দল বিএনপি সংবিধান সংশোধনে সংসদীয় কমিটি গঠন করে। কমিটিতে বিরোধীদের জন্য পদ রাখলেও তারা প্রতিনিধি দেয়নি।
বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া সংবিধান সংশোধন করা হলে বিতর্ক তৈরি হবে কি না, এমন প্রশ্নে কমিটির প্রধান সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিতর্ক তৈরি হবে কিনা জানি না, বিতর্ক করার একটা সুযোগ থাকবে। আমরা সবসময় আহ্বান জানাব বিরোধী দল যেন আমাদের সংবিধান সংশোধনী সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে অংশগ্রহণ করেন এবং তারা লিখিত এবং মৌখিক মতামত দিবেন।
তিনি বলেন, বিরোধী দল কমিটিতে প্রতিনিধি দিলে তাদের স্বাগত জানানো হবে। কমিটির প্রতিবেদন তৈরির পর সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে উঠলেও বিরোধী দলের আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কিন্তু যদি বিরোধীপক্ষ তারপরও না আসে আমাদের তো সংবিধান সংশোধনীটা নিতেই হবে। এটা জাতির প্রত্যাশা। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা আমাদের অঙ্গীকার। আমরা অপেক্ষা করতে পারব না।
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকা নিয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজের সমালোচনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। ওই কমিশনের সহসভাপতি ছিলেন আলী রীয়াজ।
সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি তিনি বলেন, সরকার সেই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি ও বিরোধী দল মিলে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করাই তাদের লক্ষ্য।
তবে জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে সমাজের প্রয়োজন এবং নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আরও কিছু বিষয় সংবিধান সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, বলেন তিনি।
বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে সংশোধনের যে পদ্ধতি রয়েছে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন।
তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ অসাংবিধানিক ঘোষণা করে হাই কোর্টের দেওয়া রায়ে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হলেও আইনসভার মাধ্যমে তা আবার গঠন করতে হবে। ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি যাতে অতিরিক্ত কঠোর বা অতিরিক্ত সহজ না হয়, সে বিষয়েও বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি সংবিধান সংশোধনের বিকল্প কোনো পদ্ধতি রাখা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে, বলেন তিনি।
কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, অথচ সংবিধানে থাকা প্রয়োজন, এমন বিষয়গুলোও বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেছেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব কী ছিল, সাংবাদিকদের এই প্রশ্নে তিনি বলেন, সরকার গঠনের ধাপ ও পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হলেও বিস্তারিত প্রস্তাব এখনো পাওয়া যায়নি।
তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ক্ষেত্রে শেষ বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে রাখার বিধান বাদ দেওয়ার বিষয়ে জুলাই সনদ প্রণয়নের সময় ঐকমত্য হয়েছিল, বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেওয়া সালাহউদ্দিন বলেন, অন্য পদ্ধতিগুলোর কোনোটিতে ঐকমত্য না হলে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিচার বিভাগকে রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে অনেকে পরে লিখিত প্রস্তাব দেবেন বলে জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বৈঠকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সংবিধান ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আদালতের ক্ষমতা কতটুকু হবে, তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এখতিয়ার কী হবে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। সংবিধান সংশোধনের পর বিচার বিভাগ নিজের ব্যাখ্যার ক্ষমতা প্রয়োগ করে যাতে জনগণের প্রত্যাশার পরিপন্থি কোনো অবস্থান নিতে না পারে, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার এখতিয়ারও সংবিধানে স্পষ্ট করতে হবে। রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ যাতে অন্য অঙ্গের ওপর কর্তৃত্ব করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যায়নি।
সালাহউদ্দিন বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির বেশ কিছু বিষয় বর্তমানে আদালতের মাধ্যমে কার্যকর করা যায় না। রাষ্ট্রের সামর্থ্য অনুযায়ী সেগুলোর কিছু অংশ মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে মত এসেছে। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করার প্রস্তাবও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা রাষ্ট্র পরিচালনায় কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তা সংবিধানে আরও স্পষ্টভাবে রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে বৈঠকে বিভিন্ন প্রস্তাব আসার কথা বলেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, অনেক বিশেষজ্ঞ উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তবে বাংলাদেশ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হওয়ায় উচ্চকক্ষের কাঠামো কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উচ্চকক্ষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি রাখা, জেলাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব এবং সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে মত দিয়েছেন তারা।
উচ্চকক্ষের সদস্যরা সরাসরি নির্বাচিত হবেন, নাকি সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতিতে আসবেন, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
কমিটির সভাপতি বলেন, বিশেষজ্ঞদের দেওয়া মতামত ও প্রস্তাব পর্যালোচনা করে কমিটিতে আলোচনা করা হবে। পরে সেগুলো পুস্তিকা আকারে সংকলন করা হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মঙ্গলবারের বৈঠকে অনেকে লিখিত মতামত দিয়েছেন। অন্যদের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে।
আগামী ২৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি, বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের নিয়ে দিনব্যাপী বৈঠকের প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, দুই-তিন ঘণ্টার বৈঠকে সবার বিস্তারিত মতামত শোনা সম্ভব হয় না। সে কারণে পরবর্তী বৈঠকে পুরো দিন আলোচনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে অংশ নেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, অধ্যাপক গীতিআরা নাসরীন, অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমদ।
কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক, জয়নুল আবেদীন, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন ও মাহমুদুল হক রুবেল।
//এফ//

