মাধুরী দীক্ষিতের নাচের কথা বললে, অনুরাগীদের মনে সবার আগেই বোধহয় ‘খলনায়ক’ ছবির ‘চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়’ গানটি আসে। সরোজ খানের কোরিওগ্রাফিতে এই গানে অনুরাগীদের মনে ঝড় তোলেন মাধুরী। তাকে সঙ্গ দেন নীনা গুপ্তা। ১৯৯৩ সালে বিখ্যাত পরিচালক সুভাষ ঘাইয়ের ‘খলনায়ক’ছবিতে গানটি ছিল প্রধান আকর্ষণ।
‘চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়’ গানটি আজও ঘুম কেড়ে নেয় সর্বস্তরের বলিউড সিনেমাপ্রেমীদের। জনপ্রিয় শিল্পী অলকা ইয়াগনিক ও ইলা অরুণের জাদুকরি কণ্ঠ এবং মাধুরী দীক্ষিত ও নীনা গুপ্তার তুখোড় নাচ আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা এনে দেয় গানটিকে। বলিউডেরে অন্যতম আইকনিক এই গানটি আজও সমান জনপ্রিয়। এখনও নানা অনুষ্ঠানে ও সময়ে অসময়ে লোকের মুখে মুখে ফিরে গানটি।
সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে মাধুরী দীক্ষিতের এই গানটি রীতিমতো ইতিহাস সৃষ্টি করে। ওই সময় তাদের দু’জনের সম্পর্ক নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা চলছিল। তবে এই ছবিতে মাধুরী দীক্ষিতের বিপরীতে ছিলেন জ্যাকি শ্রফ। কিন্তু সালমানের উপস্থিতিতে জ্যাকির সঙ্গে মাধুরীর জুটি গড়া নিয়ে কোনো বিতর্ক তৈরি হয়নি। বিতর্ক শুরু হয়েছিল তুমুল জনপ্রিয় এই গানটি নিয়ে।
কারণ, গানটির কথা নিয়ে অনেকে আপত্তি করেছিলেন। তাই সেই সময় জনসমক্ষে গানটি গাওয়া বা শোনা কারো কারো কাছে ছিল রীতিমতো বিব্রতকর। তরুণরা গানটি গাইলে বা ক্যাসেট বাজালে রক্ষণশীলরা অনেকে বাধাও দিতেন।
তবে মাধুরী দীক্ষিত ও নিনা গুপ্তার এই ‘চোলি কা পিছে’গান নিয়ে যত বিতর্ক বেড়েছে, জনপ্রিয়তাও ততই বেড়েছে। আনন্দ বক্সির কথায়, লক্ষ্মীকান্ত-পেয়ারেলালের সুরে, এই গান তখন ভারতবর্ষ সহ সারা বিশ্বের বলিউড ভক্তদের মধ্যে ঝড় তুলেছে। ইলা অরুণ ও অলকা ইয়াগনিকের কণ্ঠের জাদুতে মোহিত হয়েছে তাবৎ সিনেমাপ্রেমীরা।
সরোজ খানের অনন্যসাধারণ কোরিওগ্রাফি, সুরের প্রতি ঝঙ্কারে নায়িকার উত্তাল শারীরিক হিন্দোল ও কোমরের বিভঙ্গের জ্বরে পুড়েছে কোটি কোটি দর্শক হৃদয়। হলে উপছে পড়েছে দর্শক। তারা লাইন দিয়ে টিকিট কিনেছেন এই গানে মাধুরীর নাচ দেখার জন্য। শুধু তাই নয়, সেই ক্যাসেটের যুগে ‘চোলি কে পিছে’ গানের সঙ্গে মাধুরীর হট নাচ দেখার জন্য, ‘খলনায়ক’ছবির ক্যাসেট মাত্র এক সপ্তাহে এক কোটির উপরে বিক্রি হয়েছিল!
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, বিতর্ক কিন্তু ছবিতে গানটির উপস্থিতি বা গানের কথার উপরে কোনো ছাপ ফেলতে পারেনি। সেন্সর বোর্ডের কাঁচি থেকেও বেঁচে গিয়েছিল ‘চোলি কে পিছে’। যদিও সেই সময়ে একযোগে ৩২টি সংগঠন এই গান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। বিতর্ক উঠেছিল ভারতের জাতীয় সংসদেও।
শোনা যায়, সেই সময় এক অনুষ্ঠানে ইলা অরুণ ‘চোলি কে পিছে’ গানটি গাইতে পারেন জেনে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু, অধিকাংশ মানুষ গানটি ও তার চিত্রায়ণ সাদরে গ্রহণ করেছেন। আজও বলিউডের কোনো অনুষ্ঠানে মাধুরী দীক্ষিত মঞ্চে নাচলে ‘চোলি কে পিছে’-র টিউন বেজে ওঠে।
যদিও ১৯৯৩ সালে গানটি নিয়ে আপত্তি উঠেছিল, কিন্তু কিছু করতে পারেননি রক্ষণশীলরা। তবে পরের বছর, ১৯৯৪ সালে ‘খুদ্দার’ ছবিতে আলিশা চিনয়ের গলায় কারিশমা কাপুরের পারফরম্যান্সে ‘সেক্সি সেক্সি মুঝে লোক বোলে’ নিয়ে জোর আপত্তি ওঠে। ফলে গানের কথা বদলে ‘বেবি বেবি মুঝে লোক বোলে’ করা হয়! দূরদর্শনে গানটির এই দুটো ভার্সনই অনেকে দেখেছেন।
২০০৮ সালে যখন ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’ মুক্তি পায়, তখন এক সাক্ষাৎকারে ইলা অরুণ ও অলকা ইয়াগনিক দু’জনেই বলেছিলেন যে, ছবির ‘রিঙ্গা রিঙ্গা’ গানটি তাদের ‘চোলি কে পিছে’ গানটির সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত।
এরপর অনেক সময় পেরিয়ে গেছে, শ্লীলতা-অশ্লীলতা নিয়ে বদলে গেছে সমাজের ভাবনা, তাই ‘চোলি কে পিছে’ গানটি এখন এক কিংবদন্তি!
‘খলনায়ক’ ছবির বিতর্কিত এই “চোলি কে পিচে কেয়া হ্যায়” গানটি ব্লকবাস্টার হিট করেছিল তার মনোমুগ্ধকর পরিবেশনার জন্য। গানটির কথা, সুর, কণ্ঠ ও কোরিওগ্রাফি ছিল অসাধারণ। আর মাধুরীর নাচ ছিল অবিস্মরণীয়। ফলে গানটি দ্রুত শ্রোতাদের মন জয় করে।
আনন্দ বক্সীর লেখা এই গানের কথাগুলো ছিল কৌতুকপূর্ণ ও মনোমুগ্ধকর, যা গানটির আবেদন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। যেমন, গানে চোলির (ব্লাউজ) পিছনে কী লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে বারবার জিজ্ঞাসা, দর্শকদের কৌতূহল ও মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। তেমনি চুনরিকে (ওড়না) নিচে কী আছে, এই প্রশ্নও শ্রোতাদের উত্তপ্ত করে। আর মাধুরীর আইকনিক পরিবেশনা ও নৃত্যের ক্যারিশমা গানটিকে জীবন্ত করে তোলে।
নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে মুক্তি পাওয়া এই গানটির সাহসী উচ্চারণ, শব্দ চয়ন ও যৌন আবেদন কালের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন যুগের সূচনা করে, যা দর্শকদের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষ ইঙ্গিতপূর্ণ কথা ও বিষয়বস্তুর কারণে গানটি বিতর্কের জন্ম দিলেও, অধিকাংশ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় হয়।
বলা যায়, এই গানটির তুমুল জনপ্রিয়তার জন্যই ‘খলনায়ক’বক্স অফিসে বড় সাফল্য পায়। আর “চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়” ব্লকবাস্টার হিট হয়ে মাধুরীর কালজয়ী নাচের রেকর্ড গড়ে। সঙ্গে সঙ্গে গানটিও বলিউডের সেরা গানের তালিকায় স্থান করে নেয়।
দ্যুতিময় বুলবুল: লেখক, সাংবাদিক, গবেষক।
//L//

