আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নদীতে বিষ প্রয়োগ করে অবৈধভাবে মাছ ধরার কারণে চরম সংকটে পড়েছে এর জলজ জীববৈচিত্র্য। এর পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধভাবে সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা বন্ধে একটি বিশেষ ‘বিষ শনাক্তকরণ ল্যাবরেটরি’ স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আগামী বছর থেকে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, এ ল্যাবরেটরি স্থাপিত হলে রাসায়নিক ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিষ প্রয়োগে মাছ ধরার অপরাধ আদালতে প্রমাণ করা সহজ হবে এবং অবৈধ মাছ শিকার অনেকাংশে কমে আসবে বলে বন বিভাগ আশা করছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বিষাক্ত রাসায়নিক পরীক্ষা ও শনাক্তকরণের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে। শিগগিরই এটি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, যা পরবর্তীতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আগামী বছর থেকে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের অপরাধে নিয়মিত অভিযান ও আসামি গ্রেপ্তার করা হলেও দ্রুত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় আদালতে অপরাধ প্রমাণ করতে বেগ পেতে হয়। উপযুক্ত কিট ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়া জব্দকৃত মাছ বিষাক্ত নাকি খাওয়ার জন্য নিরাপদ, তা তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ কারণে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে অনেক সময় অভিযুক্তরা ছাড়া পেয়ে যায়।
বন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারের ঘটনায় ৭৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৭৪ জন অভিযুক্তের মধ্যে ৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ অভিযানে ৮৭ বোতল ও ২ লিটার বিষ, ২৪৩.৫ কেজি চিংড়ি, ২১০ কেজি সাদা মাছ, ৭৩৬ কেজি কাঁকড়া, ১৪৪টি নৌকা এবং ১২৫টি অবৈধ জাল জব্দ করা হয়।
প্রকল্পের বিষয়টি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে উল্লেখ করে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, বিষয়টি বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হবে। ল্যাবরেটরির সঙ্গে কিটও থাকবে। যাতে করে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করা যায়।
তিনি বলেন, মাছে প্রয়োগ করা বিষ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। এ কারণে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করতে না পারলে বিষয়টি প্রমাণ করা দুরূহ। এ কারণেই এ প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ নিরাপদ থাকবে বলে প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, বিষ পরীক্ষার জন্য সরকার সাময়িকভাবে বিদেশ থেকে টেস্ট কিট আমদানি করতে পারে। এছাড়াও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনকে দ্রুত পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
তিনি বলেন, জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে বিষাক্ত পানি ছড়িয়ে পড়লে জলজ পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীদের স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ড. সুজাত আহমেদ সতর্ক করে বলেন, বিষাক্ত বা রাসায়নিকযুক্ত মাছ নিয়মিত খেলে তা রক্তের মাধ্যমে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ে লিভার সিরোসিস, কিডনি রোগ ও পাকস্থলীর ক্যানসারের মতো জটিল রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ বিষ শনাক্তকরণ ল্যাবরেটরি দ্রুত স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন পরিবেশবিদ ও গবেষকরা। সূত্র: বাসস
//এফ//

