লাইফস্টাইল ডেস্ক
হৃদরোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে ‘টাইম ইজ মাসল’। অর্থাৎ হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর যত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, রোগীর হৃদযন্ত্রের পেশি তত বেশি বাঁচানো সম্ভব হবে। প্রতি বছর বহু মানুষ শুধু সময়মতো প্রাথমিক চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে কিংবা সাধারণ কিছু ভুলের জন্য প্রাণ হারান।
হার্ট অ্যাটাক যেকোনো সময়, যে কারও হতে পারে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথম কয়েক মিনিটে সঠিক পদক্ষেপ নিলে রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব।
লক্ষণগুলো আগে চেনা জরুরি
সবার ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ একই রকম নাও হতে পারে। তবে সাধারণ কিছু স্পষ্ট উপসর্গ রয়েছে:
বুকের ঠিক মাঝখানে বা বাঁ পাশে তীব্র ব্যথা, ভারী চাপ, শক্ত হয়ে আসা বা মোচড় দেওয়ার মতো অনুভূতি।
বুক থেকে ব্যথা বাঁ বাহু, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল, পিঠ কিংবা পেটের ওপরের অংশে ছড়িয়ে পড়া।
শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, দম আটকে আসার অনুভূতি।
শরীর অতিরিক্ত ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এবং অস্বাভাবিকভাবে ঘাম হওয়া।
মাথা ঘোরানো, বমি বমি ভাব বা চোখে অন্ধকার দেখা।
(বিশেষ করে নারী এবং ডায়াবেটিসের রোগীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় বুকে তীব্র ব্যথা না হয়ে কেবল অতিরিক্ত ক্লান্তি, পেট ফাঁপা বা শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।)
১. কালক্ষেপণ না করে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করুন
লক্ষণ দেখা মাত্রই কোনো ইতস্তত না করে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করুন অথবা নিকটস্থ হৃদরোগ হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন। রোগীকে কখনই নিজে ড্রাইভ করে হাসপাতালে যেতে দেবেন না। কারণ পথিমধ্যে রোগীর জ্ঞান হারানোর ঝুঁকি থাকে।
২. রোগীকে শুইয়ে না দিয়ে হেলান দিয়ে বসান
আক্রান্ত ব্যক্তিকে পুরোপুরি শুইয়ে দেওয়া বিপজ্জনক, এতে তার ফুসফুসে চাপ বাড়ে এবং শ্বাসকষ্ট তীব্র হয়। রোগীকে মেঝেতে বা শক্ত জায়গায় পিঠের পেছনে বালিশ দিয়ে হেলান দিয়ে (আধা-শোয়া বা হাফ-সিটিং অবস্থায়) বসিয়ে দিন এবং তার হাঁটু সামান্য বাঁকিয়ে রাখুন। ঘরের জানালা খুলে দিয়ে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করুন। শার্টের বোতাম, টাই, বেল্ট বা আঁটসাঁট পোশাক আলগা করে দিন যাতে তার শ্বাস নিতে সুবিধা হয়।
৩. দ্রুত অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খেতে দিন
যদি আক্রান্ত ব্যক্তির অ্যাসপিরিন সেবনে কোনো ধরনের অ্যালার্জি না থাকে, তবে দ্রুত একটি সাধারণ অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট (৩০০ মিলিগ্রাম) রোগীকে চিবিয়ে গিলতে দিন। পানি দিয়ে সরাসরি না গিলে চিবিয়ে খেলে ওষুধটি দ্রুত রক্তে মিশে রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়। এর ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনিতে রক্ত চলাচল কিছুটা সহজ হয়। রোগী যদি আগে থেকেই হৃদরোগের নিয়মিত রোগী হন এবং চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন থাকে, তবে সঙ্গে থাকা ‘নাইট্রোগ্লিসারিন’ স্প্রে বা ট্যাবলেট তার জিহ্বার নিচে দেওয়া যেতে পারে।
৪. আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন
রোগী আতঙ্কিত হয়ে পড়লে তার হৃদস্পন্দন এবং রক্তচাপ দুটোই দ্রুত বেড়ে যায়, যা পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক করে তোলে। তাকে আশ্বস্ত করুন এবং গভীর ও ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে বলুন। আশপাশে অতিরিক্ত মানুষের ভিড় জমতে দেবেন না।
৫. রোগী অজ্ঞান হয়ে গেলে কালবিলম্ব না করে ‘সিপিআর’ দিন
যদি দেখা যায় রোগী হঠাৎ অচেতন হয়ে গেছেন এবং তার নাড়ির স্পন্দন বা শ্বাস-প্রশ্বাস পাওয়া যাচ্ছে না, তবে সঙ্গে সঙ্গে ‘সিপিআর’ (কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন) শুরু করতে হবে।
দুই হাতের তালু একটার ওপর আরেকটি রেখে রোগীর বুকের ঠিক মাঝখানে রাখুন। কনুই সোজা রেখে নিজের শরীরের ভার দিয়ে প্রতি মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ বার গতিতে শক্তভাবে চাপ দিতে থাকুন (চেস্ট কম্প্রেশন)।
অ্যাম্বুলেন্স বা চিকিৎসকের দল না আসা পর্যন্ত এটি একটানা চালিয়ে যেতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক সিপিআর রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
যেসব ভুল ভুলেও করবেন না
বুকে ব্যথা হলে অনেকেই একে সাধারণ ‘গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা’ ভেবে অ্যান্টাসিড খেয়ে ঘরে বসে সময় নষ্ট করেন। এ ভুলটি কখনোই করবেন না।
রোগীকে জোর করে হাঁটিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করবেন না।
অচেতন অবস্থায় রোগীকে পানি বা কোনো তরল পান করাবেন না, এতে শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে দম আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বুকে প্রচণ্ড জোরে আঘাত বা ঝাঁকুনি দেবেন না।
হার্ট অ্যাটাকের পর প্রথম এক ঘণ্টাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। নিজের ও পরিবারের সুরক্ষায় লক্ষণগুলো চিনে রাখা এবং প্রাথমিক চিকিৎসায় সচেতন থাকাই পারে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অকালমৃত্যু ঠেকাতে।
//L//

