মেহেরপুর প্রতিনিধি
মেহেরপুরে আমন আবাদ ও শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। এরই মধ্যে সার সংকট, কীটনাশক ও জ্বালানি তেলের বাড়তি দামে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। একই সঙ্গে বেড়েছে ফসল পরিবহন ব্যয়ও। নানা সংকট মাথায় নিয়েই শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। ফলে বাম্পার ফলনের প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত বিষাদে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। তবে সংকট মোকাবিলায় কৃষকদের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
মেহেরপুরের মাঠজুড়ে আমন আবাদের পাশাপাশি শুরু হয়েছে আগাম শীতকালীন সবজি চাষের তোড়জোড়। আবাদ নিয়ে কৃষকদের যেন বসে থাকার সময় নেই। জমি প্রস্তুত, বীজ বপন, সেচ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
তবে কৃষকদের এই ব্যস্ততার মধ্যেই দেখা দিয়েছে নানা সংকট। সার, কীটনাশক ও জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম এখন তাদের দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ। প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত সার না পাওয়া এবং বাড়তি দামে সার ও ডিজেল কিনতে শুরুতেই বেড়ে যাচ্ছে উৎপাদন খরচ।
কৃষকরা জানান, সময়মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় বেশি দাম দিয়েও সার কিনতে হচ্ছে। প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত সার পাওয়া এবং সরকারিভাবে সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জেলার গাংনী উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামের আমন ধানচাষি আব্দুল আলিম বলেন, আমার দুই বিঘা জমিতে আমন ধান রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে প্রায় তিনবার সেচ দিতে হয়। পাশাপাশি মাঝেমধ্যেই কীটনাশক স্প্রে করতে হয় এবং ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি সারসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপকরণ প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু সার কিনতে গিয়ে ডিলারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। অনেক সময় চাহিদামতো বা সময়মতো সার পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। এর মধ্যে আবার তেলের দাম বেড়েছে। তেলের দাম বাড়ায় জমি চাষ, সেচসহ সব ধরনের খরচ প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।
গাংনী উপজেলার নওপাড়া গ্রামের কৃষক লাভলু মিয়া বলেন, আমি প্রতিবছর প্রায় ১০ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করি। কিন্তু এ বছর পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় মাত্র পাঁচ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করছি। সময়মতো সার না পেলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া সম্ভব হবে না। চলতি মৌসুমে কৃষকদের জন্য পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
মেহেরপুর সদর উপজেলার বৈকুণ্ঠপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল আজিজ বলেন, প্রতিবছরের মতো এ বছরও শীতকালীন বাঁধাকপি ও ফুলকপির চাষ করছি। এসব সবজি চাষে সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত সার ও অন্যান্য উপকরণ প্রয়োজন। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই পর্যাপ্ত সার পাচ্ছি না। এতে সবজি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বীজ, সার, কীটনাশকসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। ফসল উৎপাদন করতে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। পরে বাজারে ভালো দাম না পেলে আমাদের লোকসান গুনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু উৎপাদন খরচই নয়, ফসল বাজারজাত করতেও বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। মাঠ থেকে বাজারে সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য নিতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের লাভের অংশও কমে যাচ্ছে।
মুজিবনগর উপজেলার কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, মেহেরপুরের উৎপাদিত সবজি ও পেঁয়াজ দেশের অন্যান্য জেলার চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ মেহেরপুরে সার বরাদ্দ খুবই কম। এক বস্তা সার নিতে গেলেও সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাও অনেক সময় চাহিদার অর্ধেক সার পাওয়া যায়। এতে কৃষকদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। দিন দিন ফসলের উৎপাদন বাড়লেও আমরা ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছি না। সার ও কীটনাশকের দাম কমানোর পাশাপাশি ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে কৃষকরা একসময় আবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা অনেক আশা নিয়ে ফসল আবাদ করছি। ফলন ভালো হলে খরচ উঠে কিছু লাভ হবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু সার, ডিজেলসহ সবকিছুর দাম যদি এভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে কৃষকের জন্য চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে যাবে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি খরিপ-২ মৌসুমে মেহেরপুর জেলায় ২৬ হাজার ৯৩০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। এছাড়া শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৫২৫ হেক্টর জমিতে। আবাদ তুলতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রলণালয়ে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সার নিশ্চিত করতে ইউরিয়া সারের চাহিদা দেওয়া হয়েছে ২২ হাজার ৮২ টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া গেছে ২০ হাজার ৮১৯ টন। টিএসপি সারের চাহিদা দেওয়া হয়েছিল ১১ হাজার ৪৪ টন। বরাদ্দ এসেছে ৮ হাজার ৮৭৮ টন। ডিএপি সারের চাহিদা ছিল ১১ হাজার ৮০২ টন, বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া গেছে ১০ হাজার ৯৯৫ টন। এছাড়া এমওপি সারের চাহিদা ৭ হাজার ৭৮৫ টন হলেও বরাদ্দ পাওয়া গেছে ৭ হাজার ৪৯৩ টন।
//L//

