দ্যুতিময় বুলবুল:
আজ ২৩ জুন, ২০২৬, রোজ মঙ্গলবার। ঐতিহাসিক পলাশী দিবস। একটি চরম ট্রাজেডির দিন। বাঙালি, বাংলা ও ভারতবাসীর জীবনে অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়। ২৬৯ বছর আগে, ১৭৫৭ সালের এই দিনে, পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলায় ভাগীরথী নদীর পূর্ব তীরে, পলাশীর আম্রকাননে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে মুখোমুখী যুদ্ধে, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। তারপর ভারতবর্ষে ইংরেজদের টানা ১৯০ বছর ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বার উন্মোচিত হয়।
তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্বল্প সংখ্যক যোদ্ধার পক্ষে নবাবের বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করা মোটেই সম্ভব ছিল না। যদি নবাবেরই শাসক গোষ্ঠীর একটি বড় অংশ কোম্পানির সঙ্গে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র না করত। তাদের ঘৃণিত ও কলঙ্কজনক প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও নবাবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে কোম্পানির একটি ছোট বাহিনীর কাছে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিশাল বাহিনীর পরাজয় ঘটে।
এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, নবাব সিরাজউদ্দৌলার নানা নবাব আলীবর্দী খানের বৈমাত্রীয় বোনের স্বামী ও সিরাজের ভাষায় তাঁর ‘পরম আত্মীয়’ তথা দূর সম্পর্কের মামা ও প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান, নবাবের আপন বড় খালা ঘসেটি বেগম, অর্থমন্ত্রী তথা দেওয়ান রাজা রায়দুর্লভ, তৎকালিন বাংলার সবচেয়ে ধনী ব্যাংকার জগৎশেঠ, নবাবের ঘনিষ্ঠ সভাসদ রাজা রাজবল্লভ, নবাবের সেনাপতি ইয়ার লতিফ খান, মীর জাফরের সহযোগী ও শিখ ব্যবসায়ী উমিচাঁদ, ব্যবসায়ী মাহতাব চাঁদ, মহারাজা স্বরূপচাঁদ, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, নন্দকুমার প্রমুখ অর্থ ও ক্ষমতালোভী, উচ্চাভিলাষী কূচক্রী মহল।
জানা যায়, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীতে ৫০ হাজার থেকে ৬৫ হাজার সৈন্য ছিল। তাদের মধ্যে পদাতিক সৈন্য ছিল প্রায় ৩৫ হাজার এবং অশ্বারোহী (ঘোড়সওয়ার) সৈন্য ছিল ১০ হাজার।
নবাবের বাহিনীর অস্ত্র ও গোলাবারুদের মূল শক্তির মধ্যে ছিল ৪০টিরও বেশি সুসজ্জিত ভারী কামান এবং বিপুল পরিমাণ গোলা-বারুদ। এছাড়াও নবাবের যুদ্ধ বহরে রণহস্তীও (হাতি) যুক্ত ছিল।
যুদ্ধে নবাবের এই বিশাল সেনাবাহিনী ও অস্ত্রভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও, যুদ্ধের ময়দানে প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান, সেনাপতি ইয়ার লতিফ খান ও রাজা রায়দুর্লভের চরম বিশ্বাসঘাতকতার কারণে এই বিশাল সেনাবাহিনীর প্রায় ৪৫ হাজার সৈন্য যুদ্ধে অংশ না নিয়ে নির্লিপ্তভাবে ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিল।
অথচ যুদ্ধযাত্রার আগে নবাবের সামনে, বিশ্বাসঘাতক আত্মীয় প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান পবিত্র কুরআন হাতে নিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সামনে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, শরীরের একবিন্দু রক্ত থাকতেও তিনি বাংলার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হতে দেবেন না।
নবাব আগে থেকেই জানতেন, তাঁর বিরুদ্ধে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র চলছে। কারা এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত, সেটাও তিনি জানতেন। মীর জাফর সহ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়েও, শেষ পর্যন্ত সরে আসেন তিনি। নবাব ভেবেছিলেন, যুদ্ধের আগে কাউকে শাস্তি দিলে, ফল ভালো নাও হতে পারে। তাই সে পথে যান নি তিনি।
ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে মীমাংসা করেন তিনি। তারপর মীর জাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, মীর মদন, মোহনলাল ও ফরাসি সেনাপতি সাফ্রেঁকে নিজ নিজ দায়িত্ব অনুযায়ী যুদ্ধ পরিচালনার ভার দিয়ে, তাদের সঙ্গে পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধযাত্রা শুরু করেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা।
কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা নবাবকে ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে প্রতিশ্রুতি দিলেও, তারা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন নি। নবাবের পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন মাত্র কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মকর্তা, যার মধ্যে নবাবের গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান ও অত্যন্ত বিশ্বস্ত সেনাপতি মীর মদন, সেনাপতি মোহনলাল, খাজা আব্দুল হাদী খান, নবে সিং হাজারী এবং তাদের নেতৃত্বাধীন সৈন্যরা। পাশাপশি ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রেঁ এর নেতৃত্বে একটি ফরাসি সৈন্য দল লড়াই চালিয়ে যায়।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সকাল ৮টার দিকে পলাশীর আম্রকাননে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথমেই নবাবের সেনাপতি মীর মদন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনীর ওপর আক্রমণ শুরু করেন। মীর মদনের বীরত্বপূর্ণ আক্রমণে রবার্ট ক্লাইভের যোদ্ধারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
এক পর্যায়ে মীর মদনের প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে, ক্লাইভ তার সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেন। এ সময় ক্লাইভ বিচলিত হয়ে পড়েন। মীর মদন তাঁর বাহিনী নিয়ে ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগুতে থাকেন।
কিন্তু মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, রায়দুর্লভ-যে যেখানে সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন, সেখানেই নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাদের সামান্য সহায়তা পেলে, মীর মদন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনীকে হয়তো দুপুরের আগেই পরাজয় বরণে বাধ্য করতে পারতেন।
ইতোমধ্যে, দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি নামে। সিরাজদ্দৌলার গোলাবারুদ ভিজে যায়। তবুও সাহসী মীর মদন কোম্পানির সৈন্যদের সঙ্গে বীরত্বের সঙ্গে প্রবল বেগে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে, বেলা তিনটার দিকে হঠাৎ কোম্পানির কামানের গোলার আঘাতে মীর মদন নিহত হন। তাঁর সঙ্গে নবে সিং হাজারী ও বাহাদুর খান প্রমুখ গোলন্দাজ বাহিনীর কর্মকর্তা নিহত হন।
ফলে নবাব শোক ও হতাশায় ভেঙে পড়েন। তারপরও সেনাপতি মোহনলাল অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে দুর্বার গতিতে জীবনপণ যুদ্ধ চালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত নবাবের প্রতি অনুগত ছিলেন। সেনাপতি মোহনলালের পাশাপাশি নবাবের পক্ষে ফরাসি গোলন্দাজ বা আর্টিলারি বাহিনীর অধিনায়ক সিনফ্রেঁ (Sinfray) শেষ পর্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যান।
যুদ্ধে নবাবের জয় প্রায় নিশ্চিত বুঝতে পেরে, ক্লাইভ বাহিনী ক্রমশ আমবাগানের দিকে আড়াল হতে থাকে এবং ক্লাইভ দিনে যুদ্ধ কোনো ভাবে চালিয়ে রেখে, রাতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এতে মীর জাফর সহ সিরাজের বাহিনীর বাকি বিশ্বাসঘাতকরা প্রমাদ গুনতে শুরু করেন।
কিন্তু মীর মদন সহ সিনিয়র কর্মকর্তাদের মৃত্যুর শোকে হতাশ হয়ে মীর জাফরের কাছে যুদ্ধের বিষয়ে পরামর্শ চান নবাব সিরাজউদ্দৌলা। এটাই নবাবের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এই সুযোগ আর হাতছাড়া করতে চান নি মীর জাফর। তিনি নবাবকে যুদ্ধ বন্ধ করে পরের দিন নতুন উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করার পরামর্শ দেন।
কিন্তু নিশ্চিত বিজয়ের পথে আগুয়ান, সেনাপতি মোহনলাল সহ নবাবের যোদ্ধারা যুদ্ধ বন্ধের বিরুদ্ধে প্রবল আপত্তি জানান। তাদের জোর বিরোধিতা সত্ত্বেও, নবাব বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের কূট কৌশলের ফাঁদে পা দিয়ে, যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দেন। মীরজাফর আবারও বিশ্বাসঘাতকতা করে তার সৈন্যবাহিনীকে শিবিরে ফেরার নির্দেশ দেন। ফলে নবাবের সৈন্যরা যুদ্ধ বন্ধ করে, ময়দান থেকে ফিরতে শুরু করে।
এ সময়, মীর জাফর রবার্ট ক্লাইভের কাছে নবাবের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার নতুন সিদ্ধান্তের গোপন বার্তা পাঠিয়ে দেন। এই খবর পেয়ে হতাশ ক্লাইভ ও তার কোম্পানির যোদ্ধারা নতুন প্রাণ ফিরে পায়। আর এই সুযোগে ক্লাইভের সেনারা নবাবের নিরস্ত্র ও অপ্রস্তুত বাহিনীর ওপর পেছন থেকে হামলা চালায়।
ফলে নবাবের অনেক সৈন্য হতাহত হয় এবং তাদের ছাউনি ক্লাইভের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যরা দখল করে। নিশ্চিত জেতা যুদ্ধে নবাবেব সেনারা পরাজিত হয় এবং হতাশ ক্লাইভ বাহিনী এই যুদ্ধে অপ্রত্যাশিত ভাবে জয়লাভ করে, তখন ঘড়িতে সময় বিকেল ৫টা। মাত্র ৮/৯ ঘণ্টার যুদ্ধ!
এদিকে, পরাজয় নিশ্চিত জেনে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই ময়দান থেকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা রাজধানী রক্ষার জন্য মাত্র ২ হাজার সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু রাজধানী রক্ষার জন্য কারো সাহায্য পাননি তিনি।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি সৈন্য ও অস্ত্র-শস্ত্র থাকা সত্ত্বেও, নবাবের বাহিনী পরাজিত হয়। মূলত, প্রধান সেনাপতি মীর জাফর সহ একাধিক সেনপতি ক্ষমতা ও অর্থের লোভে নবাবের সঙ্গে বেঈমানির কারণে এই বিপর্যয় ঘটে।
যার ফলে, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে শুধু নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটেনি, বাংলা বিহার উড়িষ্যা সহ সারা ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। এই যুদ্ধ ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের ভীত্তিপ্রস্তরের পাশাপাশি, ভারতবাসীর ১৯০ বছর ইংরেজদের গোলামির দ্বার উন্মোচন করে!
দ্যুতিময় বুলবুল: লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষক।

