মাধুরী দীক্ষিতের কালজয়ী ছবির গানের নাচগুলোর মধ্যে বলিউডের “হাম আপকে হ্যায় কৌন..!” ছবির অন্যতম গান ‘দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা’। তুমুল জনপ্রিয় এই গানে দারুণ নেচেছেন মাধুরী। ১৯৯৪ সালের ০৫ আগস্ট বলিউডে মুক্তি পাওয়া ছবিটির ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই গানটি গেয়েছেন, বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী লতা মঙ্গেশকর ও এসপি বালাসুব্রহ্মণ্যম। গানটির সুর করেছেন রামলক্ষ্মণ। আর গানের কথা লিখেছেন দেব কোহলি। মাধুরী দীক্ষিত এবং সালমান খান একটি শিশুর স্নান অনুষ্ঠানে এই গানটির সঙ্গে নেচেছেন।
রোমান্টিক এই গানটি মুক্তির পরপরই দ্রুত মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সঙ্গীত চার্টে তর তর করে শীর্ষে পৌঁছে যায়। শুধু তাই নয়, গানটির তুমুল জনপ্রিয়তার জন্য লতা মঙ্গেশকর ফিল্মফেয়ার স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
আরো অবাক ব্যাপার হচ্ছে, আনা সিং-এর ডিজাইন করা মাধুরীর নাচে পরা উজ্জ্বল বেগুনি রঙের ফ্যাকাশে জেডেড সাটিন শাড়িটিও বিখ্যাত হয়ে যায়। মাধুরী দীক্ষিত এই শাড়িটির সঙ্গে একটি পিঠখোলা খিদকি-ব্লাউজ পরেছিলেন। শাড়িটির দাম ছিল ₹ 1.5 মিলিয়ন (US$18,000) রূপি। ছবিটি মুক্তির পর, বাজারে শাড়িটির ব্যাপক ট্রেন্ডিং হয়। বিক্রিও হয় প্রচুর।
শাড়িটিকে ‘দ্য ট্রিবিউন’ এবং ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ উভয় গণমাধ্যম “সবচেয়ে আলোচিত শাড়ি”গুলোর মধ্যে একটি হিসাবে বর্ণনা করেছিল।শাড়িটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছিল যে, সারা বিশ্বে বসবাসকারী দক্ষিণ এশিয়ার শাড়িপ্রেমী সামর্থবান নারীরা শাড়িটি কেনার জন্য দোকানে দোকানে ভীড় জমিয়েছিলেন। শুধু কী তাই? এই পোশাক পরা পুতুল বাজারজাত করা হলে, সেই পুতুল কিনতেও হিড়িক পড়ে যায়। এমনকী, বিয়ের মৌসুমে কনের বেগুনি রঙের শাড়ি পরাও একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায়।
গানটি ড্যান্স রিদম ভিডিও গেম জাস্ট ড্যান্স ৩- তেও প্রদর্শিত হয়। গানটি বলিউড রেইনবো-এর “কুরি কো উদ্দা লে জানা” হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। মুক্তির পরপরই গানটি তাৎক্ষণিকভাবে এতটাই খ্যাতি অর্জন করে যে, ₹ ১১.৭ কোটি রূপি (১.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) এরও বেশি বিক্রি করে এবং ছবিটি মুক্তির আগেই ফিলিপস টপ ১০, বিপিএল ওয়ে! এবং সুপারহিট মুকাবিলার শীর্ষে স্থান করে নেয়। আর সঙ্গীত প্রযোজনা সংস্থা, হিজ মাস্টার্স ভয়েস, ৩০ লাখেরও বেশি টেপ রেকর্ড বিক্রি করে।
‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ পত্রিকার মতে, “দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা” ওস্তাদ নুসরত ফতেহ আলী খানের “সারে নবীয়ান” গানটি দ্বারা অনুপ্রাণিত। গানটির মিউজিক ভিডিও সেটের জাঁকজমক ছিল ওই সময় সবার সেরা। মাধুরীর নৃত্য এবং লুক ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
ভারতের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন “হাম আপকে হ্যায় কৌন…!” সিনেমায় “দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা” গানটি দেখার পর মাধুরী দীক্ষিতের দিওয়ানা হয়ে পড়েন। হুসেন মাধুরী প্রেমে এতটাই পাগল হয়ে যান যে, ছবিটি তিনি ৬৭ বার দেখেছিলেন। গানটিতে মাধুরীর নৃত্য সম্পর্কে মকবুল ফিদা হুসেন বলেছেন, “শরীরের নিম্ন অংশের সেই নৃত্য, এই জগতের বাইরের। আমি এমন নৃত্যশিল্পী কখনও দেখিনি, এবং আমি সেরাটি দেখেছি। গানের কথাগুলো মাধুরীর দেহের ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে।” মকবুল ফিদা হুসেন মাধুরীর এই নাচ ও রূপে মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়ে বহু চিত্রকর্ম এঁকেছিলেন।
২০০৬ সালে “সা রে গা মা” থেকে “রাজশ্রী: আ রেট্রোস্পেক্ট (৪-সিডি)” অ্যালবামে প্রকাশিত, রাজশ্রী প্রোডাকশনের ৬০ বছরের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের গানের তালিকায় “দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা” গানটিও রয়েছে। ছবিটি মুক্তির ২০ বছর পর, ২০১৪ সালে, “টাইমস অফ ইন্ডিয়া” পত্রিকা ‘দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা’ গানটিকে “প্রতিটি ঋতুর জন্য একটি গান” বলে অভিহিত করে।
বলিউডের সর্বকালের সেরা পারিবারিক চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে “হাম আপকে হ্যায় কৌন…!” ছবিটি অন্যতম। সেই সময়ের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল ছবিটি। অ্যাকশন ছবি থেকে সরে এসে রোমান্টিক এবং সৃজনশীল ধারার ছবি তৈরি করার প্রচেষ্টা এখান থেকেই শুরু হয়। ছবিটিতে কোনো ভিলেন ছিল না। এদিক থেকেও ছবিটি ইতিহাস গড়ে।
সেই সময়ে ৬ কোটি টাকা বাজেটে নির্মিত এই ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন..! ছবিটি বিশ্বব্যাপী ₹ ১১১.৬৩ কোটি রূপি থেকে ₹ ১২৮ কোটি রূপি আয় করে। ফলে ছবিটি বছরের সর্বোচ্চ আয়কারী চলচ্চিত্রের গৌরব অর্জন করে। শুধু তাই নয়, মুক্তির সময় ছবিটি সর্বোচ্চ আয়কারী ভারতীয় চলচ্চিত্রের মর্যাদা লাভ করে। নিশার চরিত্রে অভিনয় করে মাধুরী দীক্ষিত পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন ২৭,৫৩৫,৭২৯ টাকা, যা সেই সময় খুব কম অভিনেত্রী পেতেন।
“হাম আপকো হ্যায় কৌন–?” ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ছবিটি ভারতে ₹ ১০০ কোটির বেশি আয়কারী প্রথম চলচ্চিত্র। মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করলে, ছবিটি ১৯৯০-এর দশকের সর্বোচ্চ আয়কারী ভারতীয় চলচ্চিত্র। আর সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়কারী বলিউড চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।
বক্স অফিস ইন্ডিয়া ছবিটিকে “আধুনিক যুগের বৃহত্তম ব্লকবাস্টার” ছবির মর্যাদায় ভূষিত করেছে। প্রেক্ষাগৃহে ২০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলেছে। ছবিটি তেলেগুতে ‘প্রেমালয়ম’ নামেও ডাব করা হয়েছিল। এটি একটি বিরাট সাফল্য ছিল।
৪০তম ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে, শীর্ষ ১৩টি মনোনয়ন পেয়েছিল, “হাম আপকে হ্যায় কৌন..!” ছবিটি। তবে জিতেছিল পাঁচটি পুরস্কার। সেগুলো হলো- সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালক (সূরজ বরজাতিয়া), সেরা অভিনেত্রী (মাধুরী), সেরা চিত্রনাট্য (সূরজ বরজাতিয়া) এবং বিশেষ পুরষ্কার (“দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা” গানের জন্য, লতা মঙ্গেশকর)। অনুষ্ঠানের রানার আপ হয়েছিল ছবিটি।
মাধুরী দীক্ষিত “আনজাম” এবং “হাম আপকে হ্যায় কৌন..!” ছবিতে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর জন্য দুটি মনোনয়ন পেয়েছিলেন। জিতেছিলেন “হাম আপকে হ্যায় কৌন..!” ছবির জন্য।
এছাড়া হাম আপকে হ্যায় কৌন..! ছবিটি ৪২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে, দুটি পুরস্কার জয় করেছিল। এর একটি হলো, “সেরা জনপ্রিয় চলচ্চিত্র” পুরস্কার এবং অপরটি হচ্ছে- ছবিতে প্রদর্শিত সমস্ত গানের জন্য সেরা নৃত্যশিল্পীর পুরষ্কার। সেটা পেয়েছিলেন জয় বোরাডে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত, এই চলচ্চিত্রটি ছয়টি স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডও জিতেছিল। সেগুলো হচ্ছে, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (সালমান খান), শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী (মাধুরী দীক্ষিত), শ্রেষ্ঠ পরিচালক (সুরজ বরজাতিয়া), শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক (রামলক্ষণ), শ্রেষ্ঠ গীতিকার (দেব কোহলি) ও শ্রেষ্ঠ নবাগত অভিনেতা (মোহনিশ বেহল)।
হাম আপকে হ্যায় কৌন..! ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পে বিপ্লব এনেছিল। পাশাপাশি পপ সংস্কৃতিতেও সবচেয়ে প্রভাবশালী চলচ্চিত্রগুলোর একটি। ছবিটির গান, বিশেষ করে দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা গানটি বিবাহ সহ নানা উৎসবে-অনুষ্ঠানে আজও আইকনিক ভূমিকা পালন করে।
দ্যুতিময় বুলবুল: লেখক, সাংবাদিক, গবেষক
//L//

