দ্যুতিময় বুলবুল
বলিউডের সবচে’ সফল ছবিগুলোর একটি হলো “দেবদাস”। এই ছবিটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ১.৬৮ বিলিয়ন রুপি বা ৩৫ মিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। ফলে ২০০২ সালের সর্বোচ্চ আয়কারী ভারতীয় চলচ্চিত্রের মর্যাদা অর্জন করে দেবদাস। অনেকের মতে, বলিউডের দুই শীর্ষ অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়া রাই ও মাধুরী দীক্ষিতের “দোলা রে দোলা”গানে অনন্য যুগলবন্দী নৃত্যের জন্য, ছবিটি ব্লকবাস্টার হয়ে ওঠে।
দেবদাস নিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ২০টি সিনেমা তৈরি হলেও, দর্শকপ্রিয়তার দিক থেকে বলিউডের বিখ্যাত নির্মাতা সঞ্জয় লীলা বনসালির দেবদাস চলচ্চিত্রটি সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল। ২০০২ সালের ১২ জুলাই মুক্তিপ্রাপ্ত এই হিন্দি ছবির নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন শাহরুখ খান। তার প্রেমিকা পার্বতী (পারু) চরিত্রে ছিলেন ঐশ্বরিয়া রাই ও চন্দ্রমুখী চরিত্রে ছিলেন মাধুরী দীক্ষিত।
ছবিতে বলিউডের তিন সেরা সুপারস্টার একসঙ্গে পর্দায় উপস্থিত থাকার কারণে, দেবদাস নিয়ে জনমনে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়। মুক্তি পাওয়ার পর ঝড় ওঠে সিনেদুনিয়ায়। ট্রাজিক প্রেমের সিনেমাটি লুফে নেয় সিনেপ্রেমীরা।
ছবিটির সবচে’ জনপ্রিয় গান “দোলা রে দোলা”। এই গানে দুই সেরা বলিউড সুন্দরী ঐশ্বরিয়া রাই ও মাধুরী দীক্ষিত অসাধারণ নেচেছেন। তাদের অনন্য-অনবদ্য ও বিরল-বেনজির দ্বৈত নৃত্য দর্শক-শ্রোতা ও সমালোচকদের দারুণ মুগ্ধ করে।
গানটি গেয়েছেন জনপ্রিয় শিল্পী কবিতা কৃষ্ণমুর্তি, শ্রেয়া ঘোষাল এবং কে কে। গানটিতে সুর দিয়েছেন, ইসমাইল দরবার। লিখেছেন, নুসরাত বাদ্র।
দেবদাস ২০০২ সালে ১০টি বিভাগে “ফিল্মফেয়ার পুরস্কার” পেয়েছে। ফিল্মফেয়ার বিজয়ী শ্রেষ্ঠ অভিনেতা শাহরুখ খান, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়া রাই, শ্রেষ্ঠ পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনসালি এবং শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিত। এছাড়া ডোলা রে ডোলা গানের জন্য শ্রেষ্ঠ মহিলা কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন কবিতা কৃষ্ণমুর্তি ও শ্রেয়া ঘোষাল। এর পাশাপাশি পাঁচটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিল এই ছবিটি।
দেবদাস আইফা পুরস্কার এ ২০০২ সালে সর্বমোট ছয়টি বিভাগে পুরস্কার লাভ করে। শ্রেষ্ঠ অভিনেতা শাহরুখ খান, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়া রাই, শ্রেষ্ঠ পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনসালি, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী কিরণ খের, শ্রেষ্ঠ মহিলা কণ্ঠশিল্পী কবিতা কৃষ্ণমুর্তি এবং শ্রেয়া ঘোষাল ” ডোলা রে ডোলা রে ” গানের জন্য।
মুক্তির সময় পর্যন্ত, দেবদাস ছিল বলিউডের সবচে’ ব্যয়বহুল ছবি। বাজেট ছিল ৫০ কোটি রুপি। ছবিটি হিন্দিতে মুক্তির পর ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, মান্দারিন, থাই ও পাঞ্জাবি ভাষায় মুক্তি পায়।
বলিউডের ইতিহাসে মাইলস্টোন এই ছবিটির চিত্রায়ন হয় মুম্বাই ফিল্মসিটি ও বিংশ শতাব্দী কলকাতায়। ছবির শুটিংয়ের জন্য ৬টি সেট নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় ২ কোটি ১০ লাখ রুপি।
ছবিতে দুর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত আসরে পার্বতী (ঐশ্বরিয়া রাই) ও চন্দ্রমুখী (মাধুরী দীক্ষিত) এর দ্বৈত নাচের এই ডোলা রে ডোলা গানটি প্রদর্শিত হয়। দু’জনেই নাচে আনন্দ ও উচ্ছ্বাসে প্রবল প্রাণবন্ত ছিলেন।
গানটির ভিডিওটি একটি বিলাসবহুল এবং ব্যয়বহুল সেটে তৈরি স্টুডিওতে চিত্রায়িত হয়েছে। এর প্রযোজনা ব্যয় ছিল ২৫ মিলিয়ন রুপি (৫১৪,৩০০ ডলার)। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করলে দাঁড়ায় ৯৫ মিলিয়ন রুপি (০.৯২ মিলিয়ন ডলার) এর সমান।
২০০৮ সালে বলিউডে মুক্তিপ্রাপ্ত “যোধা আকবর” ছবির “আজিম ও শান শাহেনশাহ” মিউজিক ভিডিও এর আগ পর্যন্ত দেবদাস ছবির দোলা রে দোলা ছিল সবচেয়ে ব্যয়বহুল বলিউড মিউজিক ভিডিও।
দোলা রে দোল গানটির জন্য নৃত্য পরিচালক সরোজ খান সেরা নৃত্য পরিচালক হিসেবে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেন। গানটির নৃত্য পরিচালনা ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। কারণ, এতে ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের মিশ্রণ ছিল। ডোলা রে দোলা গানের মাধ্যমে সরোজ খান যে নৃত্যের ধরণটি অন্বেষণ করেন,তাকে বলা হয় নটওয়ারি। এতে কত্থক এবং ভরতনাট্যমের ধাপ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সরোজ খানের মতে, “এই গানটির নাচ তার সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর মধ্যে একটি। কারণ, মাধুরী এবং ঐশ্বরিয়া উভয়ই বলিউড হার্টথ্রব অভিনেত্রী এবং দুর্দান্ত নৃত্যশিল্পী। তাই উভয়ের স্টেপ সমান ও ভালোভাবে দেওয়ার জন্য, ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়েছিল, যাতে তাদের কেউই মনে না করেন যে, তিনি যথেষ্ট ভালো করছেন না। তবে শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটেনি।”
নাচটি উভয় অভিনেত্রীর জন্য শারীরিকভাবে কঠিন ছিল। সঞ্জয় লীলা বনসালি নিজে সেটে উপস্থিত থেকে নৃত্যের প্রতিটি দৃশ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন।
শুটিংয়ের সময়, দু’কানে ভারী দুল ছিল ঐশ্বরিয়ার। সেই দুলের অধিক ওজনের কারণে তার কান কেটে রক্ত পড়ছিল। কিন্তু ঐশ্বরিয়া সেটা কাউকে বলেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি শুটিং চালিয়ে গেছেন।
গানটি দ্রুত বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। তাই গানটি সঙ্গীত ও নৃত্য পরিচালনা বিভাগে অসংখ্য পুরষ্কার জিতেছে। মাধুরী ও ঐশ্বরিয়ার সেই নাচে আজও মোহিত সিনেপ্রেমীরা।
২০১৮ সালে ব্রিটেনের “ইস্টার্ন আই” সংবাদপত্রের এক সমীক্ষায় সঞ্জয় লীলা বনসালির দেবদাস ছবির এই ডোলা রে ডোলা গানটি সর্বকালের সবচে’জনপ্রিয় হিট নাম্বার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।
সরোজ খানের অসাধারণ কোরিওগ্রাফি, অপূর্ব সেট, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি ও শ্রেয়া ঘোষালের মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠস্বর, গায়নভঙ্গী এবং অবশ্যই মাধুরী ও ঐশ্বরিয়ার চোখ ধাঁধানো নাচ-গানের দৃশ্যটিকে শুধু ছবির ইউএসপি বানিয়েই ছাড়েনি, তা ছাড়াও এই গানকে দর্শকের চোখে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
এই দেবদাস ছবির শুটের সময় মাধুরী দীক্ষিত তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তবুও তিনি কাজ থামাননি। তবে ওই অবস্থায় ডোলা রে ডোলা গানে তার নাচ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাছাড়া ছবির মেহফিলের গানও ছিল। তারপরও অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন মাধুরী। “হামপে ইয়ে কিসনে…” গানে মাধুরীর পারফর্ম আজও চর্চিত।
তবে মাধুরীর স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে পোশাকে পরিবর্তন এনেছিলেন পরিচালক। তিনি কুন্দনের কাজের বদলে শোলা দিয়ে পোশাকে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে পোশাকের ওজন অনেক কমে যায়। মাধুরীর নাচটাও সহজ হয়। এই গানের আইকনিক দৃশ্য বা হুক স্টেপ আজও কেউ ভুলতে পারেন না।
এই দেবদাস ছবিটি সঞ্জয় লীলা বনসালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা। ছবিতে ঐশ্বরিয়া, মাধুরী, শাহরুখ-প্রত্যেকের চরিত্রের উপস্থাপনা ছিল প্রশংসনীয়।
২০১৭ সালের মার্চে টুইটারে এই ছবির “মার ডালা” গানের একটি স্থিরচিত্র শেয়ার করেছিলেন মাধুরী দীক্ষিত। ওই স্থিরচিত্রের ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, “মার ডালা! ভালোবাসা অপ্রতিরোধ্য”। এই মন্তব্যের জবাবে শাহরুখ খান টুইটারে মাধুরীর উদ্দেশে লিখেছেন, “সামনে বসে চন্দ্রমুখী চরিত্রে তোমার অভিনয় দেখা সত্যি দারুণ ছিলো। একজন অভিনেতা হিসেবে সেই মুহূর্তটি ছিলো আমার কাছে সেরা। যেখানে বসে আমি বিস্ময়ের সঙ্গে পলকহীন নেত্রে শুধু তোমাকে চেয়ে চেয়ে দেখেছি।”
জুটিবদ্ধ হয়ে বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছেন শাহরুখ ও মাধুরী। কিন্তু রূপালি পর্দায় তাদের রসায়ন সবচে’ বেশি ফুটে উঠেছে “দিল তো পাগল হ্যায়” ও “দেবদাস” ছবিতে। এ ছাড়া ছবিতে “মার ডালা” গানে মাধুরীর পরিবেশনা দেখে মুগ্ধ কোটি কোটি দর্শক। যেমন মুগ্ধ স্বয়ং শাহরুখ খান।
দ্যুতিময় বুলবুল: লেখক, সাংবাদিক, গবেষক

