দুর্গা কে, কী তার পরিচয়?
দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস ও সংগ্রামের প্রতীক। তিনি সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের কাণ্ডারী। অন্যায়, অসত্য ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণা। তিনি মাতৃত্বরূপী, প্রকৃতিস্বরূপা ও আনন্দময়ী। তিনি অপরাজেয়, দুর্দমনীয়, দুর্বার, দুর্গতিনাশিনী। তিনি অশুভ, অকল্যাণ ও অসুন্দর বিনাশ করে-শুভ, সত্য এবং সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করেন।
দেবী দুর্গা আদ্যাশক্তি, অনাদিশক্তি, নারয়নী। তিনি রণরঙ্গিনী, দুর্গেশ্বরী, দশভূজা মহিষাসুরমর্দিনী। তিনি সর্বমন্ত্রময়ী, পরমেশ্বরী, ঈশ্বরশক্তি। তিনি ভগবান বিষ্ণুর বহিরঙ্গা শক্তি পরব্রক্ষ্মা। একইসঙ্গে দেবী দুর্গা পার্বতী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গায়ত্রী এবং রাধা-এই সম্মিলিত পঞ্চ প্রকৃতির মূলপ্রকৃতি (আদিম দেবী) মহাদেবী মহামায়ার রূপান্তরিত রূপ বা অভিন্ন সত্ত্বা।
শুধু তাই নয়, কালী এবং চণ্ডিও তার পরিবর্তিত রূপ বা ভিন্ন স্বরূপ। কিন্তু অভিন্ন সত্ত্বা। তিনি সৃষ্টির আদি কারণ, পরমা প্রকৃতি, জগৎজননী। সনাতন ধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থে এভাবেই দেবী দুর্গা চিত্রিত হয়েছেন।
শাস্ত্রমতে, দুর্গা সর্বোচ্চ আরাধ্য দেবী। সনাতন ধর্মীয় বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান উপাস্য তিনি। তাই দুর্গাপূজা হলো বাঙালি হিন্দুদের শ্রেষ্ঠ উৎসব। তবে দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব এখন শুধু বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় নয়, বাংলাদেশ ও নেপাল সহ ভারতীয় উপমহাদেশে একটি অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তাছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী হিন্দু সম্প্রদায় এই দুর্গোৎসব উদযাপন করে।
অবশ্য দুর্গাপূজা বাঙালির প্রধান ধর্মীয় উৎসব হয়ে উঠতে শ’ শ’ বছর লেগেছে। মূলত, দুটি কারণে দুর্গাপূজা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। একটি হচ্ছে, দূর্গার মাতৃরূপ। আদ্যাশক্তি ঈশ্বরের মাতৃরূপের প্রকাশ। জগতের কল্যাণময়ী মাতৃরূপী বলেই তিনি জগৎজননী। সর্ববিঘ্নবিনাশী ও দুর্গতিনাশিনী দুর্গা নামেই মাতৃময়ী দুর্গা হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্যা। তাই মাতৃরূপী দুর্গা দুদ্ধাংদেহী দুর্গার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার।
সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দুর্গাকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেন। মাতৃরূপে পূজা করেন। দুর্গাপূজা আসলে ঈশ্বরের মাতৃভাব ও মাতৃরূপের উপাসনা। দুর্গাপূজায় দুর্গাপ্রতিমা ও নবপত্রিকা-প্রতিমায় ঈশ্বরীয় মাতৃভাব ও মাতৃরূপই প্রতিফলিত হয়। ‘দুর্গাপ্রতিমা’ যেমন নারীর প্রতি মাতৃদৃষ্টি ও নারীর মাতৃভা প্রকাশ করে, তেমনি নারীর শক্তি-সামর্থ্যও জানিয়ে দেয়। নারীশক্তির জয় ঘোষণা করে।
দেবী দুর্গার জনপ্রিয়তার আর একটি কারণ হচ্ছে, অন্যায়, অসত্য ও অধর্মের বিরুদ্ধে তাঁর সংহার মূর্তি-যুদ্ধাংদেহী রূপ। প্রচলিত সনাতন ধর্মমতে, তিনি সকল বাধা-বিঘ্ন, রোগ-শোক, পাপ-শাপ, ভয়-ভীতি, আপদ-বিপদ এবং শত্রুমুক্ত করেন। তাই বাঙালি হিন্দুরা দেবী দুর্গাকে দশভুজা হিসেবে উপস্থাপন করেন।
তবে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেবী দুর্গার পূজা করা হয়। উত্তর ভারতে তিনি যুদ্ধংদেহী নন। সেখানে দেবী সৌম্য-শান্ত অষ্টভুজা। অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিতা হয়েও তিনি স্নিগ্ধ, কোমল, মায়াময়ী। সেখানে প্রসন্নবদনে তিনি সিংহ বা বাঘের পিঠে উপবিষ্ট হয়ে এক হাত আশীর্বাদ মুদ্রায় রেখেছেন, ভক্তদের উদ্দেশ্যে। আবার, দক্ষিণ ভারতে মূলত তিনি চর্তুভুজা, পদ্মাসনে উপবিষ্টা দেবী রূপে পূজিত হন। ভারতের বিভিন্ন স্থানে দুর্গাপূজা নবরাত্রি ব্রত রূপে উদযাপিত হয়। তবে রূপ যা-ই হোক, দেবী দুর্গা সর্বরূপেই কল্যাণী, সাধ্বী, মঙ্গলময়ী।
সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্র অনুযায়ী, বছরে দু’বার দুর্গোৎসবের প্রথা রয়েছে। একটি হলো, বসন্তকালে চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে। যেটাকে বলা হয়, বাসন্তীপূজা বা বাসন্তী দুর্গাপূজা। আর একটা হলো, শরৎকালে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে। যেটাকে বলা হয়, শারদীয় দুর্গোৎসব। বাংলায় শারদীয় দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব অধিক জনপ্রিয়। যদিও অনেক সনাতনী বাঙালি পরিবারে বাসন্তীপূজা বা বাসন্তী দুর্গোৎসব পালনের প্রথাও প্রচলিত আছে। তবে হেমন্তের পূজা একালে তেমন আর দেখা যায় না। বাসন্তী পুজো আজ প্রায় অস্তিত্বহীন।
হিন্দু শাস্ত্রমতে, দেবী দুর্গা বহু শক্তিশালী ও অত্যাচারী দৈত্য-দানব বধ করেন। সত্যযুগে তিনি অসুররাজ মহিষাসুর বধ করেছিলেন। তাই দেবীকে মহিষাসুরমর্দিনীরূপে পূজা করেন বাঙালি হিন্দুরা। স্কন্দপুরাণে বলা হয়েছে যে, রুরুদৈত্য এবং তার পুত্র দুর্গামাসুরকে বধ করেছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, তিনি দুই অসুর ভ্রাতা শুম্ভ ও নিশুম্ভ, রম্ভাসুর তথা রক্তবীজ প্রমুখ অত্যাচারী দৈত্য-দানব বিনাশ করেছেন।
আবার দেবী দুর্গার সাহায্য, সহযোগিতা ও বর নিয়ে অনেক দেবতা অসুর-রাক্ষস এবং দৈত্য-দানব বধ করেছেন, মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেছেন। ব্রক্ষ্মা, বিষ্ণু, শিব, ইন্দ্র ও মনু সহ সত্যযুগে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য, ত্রেতাযুগে লঙ্কেশ্বর রাক্ষসরাজ রাবণ ও তার প্রতিপক্ষ অযোদ্ধার রাজা দশরথ পুত্র রামচন্দ্র যুদ্ধজয়ের জন্য তাঁর আরাধনা করেছেন, কার্তাবির্জাজুন বধের জন্য পরশুরাম দেবী দুর্গার পূজা করেছেন।
শুধু তাই না, দ্বাপরযুগে কৃষ্ণকে পেতে গোপ-কুমারীরা দুর্গার পূজা করেছেন, জাগতিক মায়ার বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে ঋষি মাণ্ডব্যও দুর্গার আরাধনা করেছেন। যুগে যুগে জগতের দুর্গতিনাশ করেন বলেই তিনি দুর্গতিনাশিনী দুর্গা নামে পরিচিত।
দেবী দুর্গা ভক্তদের ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ দান করেন। তাই তিনি সর্ব কামার্থদায়িনী। তিনি জগতের অন্নদাতা। তাই তিনি অন্নদা। রুদ্রের ঘরনিও তিনি। তাই তিনি রুদ্রাণী। শত অক্ষি দিয়ে তিনি জগতের সকল কিছু লক্ষ্য করেন। তাই তিনি শতাক্ষী। তিনি পরম বৈষ্ণব। তাই তিনি বৈষ্ণবী। তাঁর অঙ্গকান্তি গৌরবর্ণা। তাই তিনি গৌরী। তিনি পর্বত দুহিতা। তাই তিনি পার্বতী।
বিভিন্ন পুরাণে দেবীর রূপ ভিন্ন ভিন্ন। তাই তাঁর নামও ভিন্ন ভিন্ন। প্রতিটি নামের যেমন অন্তর্নিহিত অর্থ আছে, তেমনি নেপথ্য কারণও আছে। পৌরাণিক কাহিনি থেকে জানা যায়, দেবীর জন্ম, জন্মস্থান, বিবাহ, আকৃতি-প্রকৃতি, চারিত্রিক বৈশিষ্ট, গুণাবলী, কীর্তি, সৃষ্টি প্রভূতি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তার নানা নামকরণ করা হয়েছে। এসব নামের স্বরূপ থেকেই দুর্গার মাতৃরূপ, চণ্ডরূপ, শক্তিরূপ, শান্তরূপ, বিধ্বংসী রূপ ও সৃজনশীল রূপের পরিচয় পাওয়া যায়।
দেবীর অন্তত ১২০টি নাম রয়েছে। তিনি পার্বতী, কালী, চণ্ডিকা, যোগমায়া, অম্বিকা, বৈষ্ণবী, মহিষাসুরসংহন্ত্রী, নারায়ণী, মহামায়া, কাত্যায়নী, দাক্ষায়ণী, অদ্রিজা, নগনন্দিনী, সিংহবাহিনী, শারদা, আনন্দময়ী প্রভূতি নামে পরিচিতা। এর মধ্যে সর্বাধিক প্রচলিত নাম ‘দুর্গা’। কেবল দুর্গা নামটির রহস্য অনুধাবন করলেই দেবীর স্বরূপ অনেকটা জানা যায়।
একই অঙ্গে তাঁর অনেক রূপ। তাই তাঁর অনেক নাম। অথচ তিনি এক ও অভিন্ন সত্ত্বা। তিনি অনন্য ও আদিশক্তির আধার। তাঁর লয় নাই, ক্ষয় নাই। ধ্বংস নাই, বিনাশ নাই। তিনি অমর, অজেয়। জগতের আদি থেকে অন্ত, তিনি বর্তমান। তাঁর মৃত্যু নেই, আছে শুধু রূপান্তর। তিনি অব্যয়-অক্ষয় মহাশক্তি মহামায়া। তার জন্ম হয় না, আবির্ভাব ঘটে। তিনি জন্ম-মৃত্যু রহিত। তিনি নির্গুণ অবস্থায় এই জগৎসংসারে বিরাজ করেন।
ব্রক্ষ্মা, বিষ্ণু ও শিব সহ বিভিন্ন দেব-দেবীর তেজপুঞ্জে সৃষ্টি হয়েও-দেবী দুর্গা সমস্ত তেজের উৎস। তিনি তেজময়ী। তিনি রুদ্রপত্নী উমা, অম্বিকা, হৈমবতী, গৌরী, ভবানীর মিলিত দৈবসত্তা। দুর্গা সপ্তশতী তে বর্ণিত আছে, দেবী দুর্গা মহাশক্তি ব্রহ্মার ব্রহ্মত্ব, শিবের শিবত্ব, বিষ্ণুর বিষ্ণুত্ব লাভ করে-মহাশক্তি দেব দেবীদের সমষ্টিভূত তেজপুঞ্জ থেকে স্বরূপ ধারণ করেছেন।
দুর্গা মূলত শক্তির দেবী। তাকে পরমা প্রকৃতি বলা হয়। কারণ, তিনি পরমপুরুষ শ্রীনারায়ণের প্রকৃতি। নারায়ণের প্রকৃতি বলেই তিনি শ্রীশ্রীচন্ডীর বহু শ্লোকে নারায়ণী বলে আখ্যায়িত হয়েছেন। তিনি বিষ্ণুর শক্তি ও বিষ্ণুর পরম ভক্ত। তাই তাঁকে বৈষ্ণবী বলা হয়। দেবী দুর্গা বিষ্ণুভক্তি প্রদায়িনী। তিনিই জীবের মধ্যে ভক্তিরূপে বিরাজ করেন । বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দেবীদুর্গা ঐশ্বর্য, জ্ঞান, সিদ্ধি এবং বিজয়ের প্রতীক, প্রতিমূর্তি ও প্রেরণা। তাই তাঁকে এক মহাশক্তিরূপে পূজা করা হয়।
দ্যুতিময় বুলবুল: লেখক, সাংবাদিক, গবেষক।

